ষ্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশে গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এলপিজি বাজারে একটা সংকট এবং অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধি নিয়ে যে অস্থিরতা দেখা গেছে সেটি সরকারিভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
ধারণা করা হয়েছিল নতুন দাম নির্ধারণের পর গ্যাসের দাম নিয়ে সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু বাজার ঘুরে দেখা গেছে এখনো নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ এখনো রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
বিইআরসি’র এই দামের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবু বাস্তবতা হলো কমিশন নির্ধারিত দামে বাংলাদেশ গ্যাস পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
গৃহস্থলীর রান্নার গ্যাসে গ্রাহকদের এক সিলিন্ডার গ্যাস পেতে দুই হাজার ২০০ থেকে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে, যার প্রমাণ মিলেছে।
বাংলাদেশে গ্রাহক পর্যায় থেকে অপারেটর পর্যন্ত এলপিজির যে সাপ্লাই চেইন কাজ করে সেখানে কোথায় এই দাম বৃদ্ধি হচ্ছে তার সন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে প্রতিটি স্তরেই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মুনাফার একটা চেষ্টা রয়েছে ব্যবসায়ীদের, যে কারণে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
দাম কীভাবে কোথায় বাড়লো
এলপিজির দর প্রতি মাসে বিশ্ববাজারে দামের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। তবে বাংলাদেশে এলপি গ্যাসের সাপ্লাই চেইন মূলত বেসরকারি ব্যবসায়িদের দখলে।
আমদানিকারক ও অপারেটর কোম্পানি এলপিজি বোতলজাত করে ডিলারদের মাধ্যমে সারাদেশে পাইকারি সরবরাহ করে। ডিলার বা পরিবেশকদের কাছ থেকে কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
রাজধানী ঢাকার একজন গ্রাহক রশিদ দেখিয়ে বলেন, অক্টোবর মাসের দুই তারিখে ২৫শ টাকায় ১২ কেজির এক সিলিন্ডার গ্যাস কিনেছেন। তিনি বলেন, ৫০ টাকা ডেলিভারি চার্জসহ আড়াই হাজার টাকা এক সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হয়েছে যার সরকার নির্ধারিত মূল্য ছিল ১৫৮৫ টাকা।
“সরকারি রেটে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার তো বলে দেয়, কিন্তু এটাতো বাস্তবায়ন হয় নাই। পদক্ষেপও নাই।”
এই ক্রেতা হাতিরপুলের যে বিক্রেতার কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনেছেন তিনি বেশি দাম নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি।
সরবরাহ সংকটের কারণে তার খরচ বেড়েছে, এখন নতুন দাম নির্ধারণের পরে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, সবশেষ তিনি যে গ্যাস পেয়েছেন সেখানে সিলিন্ডার প্রতি দুই হাজার টাকা খরচ পড়েছে। আর বিক্রি করছেন ২৩শ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ এখানে তিনি অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। প্রতি বোতলে তার ৪০ টাকা মুনাফা করার কথা।
“চার লাখ টাকা অ্যাডভান্স করে রেখেছি। সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে। প্রথমে বলছে ২৭ তারিখে গ্যাস দেবে, পরে বলেছে তিন তারিখ। এখন বলছে ১০ তারিখের পরে পাওয়া যেতে পারে। সবাই যদি গ্যাস দিত তাহলে সংকট থাকতো না। আমরা জুলাই আগস্ট মাসে কম দামেও গ্যাস বিক্রি করেছি।”
ঢাকার মিরপুরে একজন দোকানদারের কাছে জানতে চাইলে তিনিও জানিয়েছে সরবরাহ সংকট আছে। এক সিলিন্ডারের দাম পড়বে দুই হাজার ৪০০ টাকা।
বাস্তবতা হলো ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সবখানেই এলপিজি বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জে সদরে এলপিজি বিক্রি করেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখের পর তিনি ওই মাসে কোনো গ্যাস পাননি। মূল্য বৃদ্ধির পর ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিশ্চয়তা দিতে পারেননি কবে গ্যাস দিতে পারবেন। তবে নতুন গ্যাস দিলে তার দাম পড়বে প্রতি সিলিন্ডার দুই হাজার ২০০ টাকা।
“ডিলাররাই যদি আমাদের কাছ থেকে ২২শ টাকা দাম চায় দোকানদার কতটাকা বিক্রি করবো। সাড়ে তিনশ টাকার মতন পাইকারি রেটেই ডিফারেন্স হয়ে যাইতেছে। ১৮৩৭ টাকা আর কোথায় ২২০০।”
ডিলারদের মুনাফা
বাংলাদেশে সারাদেশে এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ীদের মধ্যে আনুমানিক ২০ হাজার ডিলার আছেন বলে জানা যায়। বিভিন্ন কোম্পানির এসব ডিলার অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস এনে পাইকারি দামে বিক্রি করে।
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মূল্য নির্ধারণ অনুযায়ী একজন ডিলার বা পরিবেশক অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে ১৭৪২ টাকা দরে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনবেন। তিনি ৫০ টাকা মুনাফা করবেন এবং বিক্রেতার জন্য থাকবে ৪০ টাকা। আর গ্রাহক ১৮৩৭ টাকা দরে সেই সিলিন্ডার বাজার থেকে কিনবেন।
ডিলারদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে অনেকেই সরবরাহ ঘাটতি দেখতে পান। পুরো মাস জুড়ে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস পেয়েছেন অনেকে।
মুন্সীগঞ্জের জাকির হোসেন যে ডিলারের কাছ থেকে পাইকারি গ্যাস কেনেন, মুন্সীগঞ্জে তার একটি গোডাউনে গিয়ে দেখা যায় সেটি বন্ধ। গ্রিন এলপিজি ওই ডিলার মোজাম্মেল জানান গত ২৬ বছর তিনি এলপিজি ব্যবসা করছেন এরকম সমস্যায় তিনি পড়েননি।
তার অভিযোগ গ্রিন এলপিজি তাকে ১৮ই সেপ্টেম্বরের পর কোনো এলপিজি সরবরাহ করতে পারেননি। নতুন দাম নির্ধারনের পর তিনি যে রেট পেয়েছেন সেখানে অপারেটর প্রতি সিলিন্ডার ১৯৯০টাকা দর দিয়েছে যেটি তার ১৭৪২ টাকায় পাওয়ার কথা।
তাদের গাড়ি কয়েকদিন ধরে মংলায় বসে আছে সেখানে তাকে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। প্রতি মাসে তিনি ২০ হাজার এলপিজি সিলিন্ডারও বিক্রি করেছেন গত সেপ্টেম্বর মাসে, তিনি সরবরাহ পেয়েছে সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ দুই হাজার। এ কারণে অতিরিক্ত খরচ পোষাতে তাকে পাইকারি বিক্রি ২২০০ টাকা দাবি করতে হয়েছে।
অর্থাৎ যেখানে ৫০ টাকা মুনাফার করার কথা সেখানে ২১০ টাকা মুনাফা না করলে তিনি পোষাতে পারবে না বলে দাবি করেন।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতিও অপারেটর পর্যায়ে অতিরিক্ত দামের বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার কমিশনে লিখিত চিঠি দিয়েছেন। সেখানে নতুন মূল্য নির্ধারণের পর অপারেটর কোম্পানি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দাম চেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবশ্য দুটি কোম্পানি সেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে দুই টাকা কমেও ডিলারদের সিলিন্ডার দিচ্ছে এমন বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।
ওই চিঠিতে দেখা যায় অপারেটর ভেদে নতুদ দাম নির্ধারণের পর ডিলারদের জন্য প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১৭৪০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত রেট দেওয়া হয়েছে।
ডিলারদের পক্ষ থেকে এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, অপারেটরদের অতিরিক্ত দাম ছাড়াও পরিবহন ব্যয়সহ নানা কারণে খরচ বেড়েছে। তাই বেশি দামে বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।
“ডিস্ট্রিবিউটর পয়েন্টে ১৮০০ বা সর্বোচ্চ ১৯০০ টাকা বিক্রি করতে পারে। অপারেটরাও আমাদের কাছে বেশি দাম চেয়েছে। আমরা বিইআরসিতে চিঠিতে লিস্ট দিয়েছি সেখানে দেখবেন হাই রেট দিয়ে রাখছে। এ অবস্থায় যদি আমরা বিইআরসি রেটে বিক্রি করতে যাই তাহলে প্রত্যেকটা ডিস্ট্রিবিউটর পুঁজি হারাবে। অনেকের ব্যাংকে লোন আছে ঋণখেলাপি হবে। ”
মি. খান বলেন, দশ বারোটা কোম্পানি আছে গ্যাসই দিতে পারছে না। এই সিলিন্ডারগুলো যদি ভরে দেওয়ার ব্যবস্থা করে সরকারের পক্ষ থেকে তাহলে সংকট সমাধান হবে। এবং প্রত্যেকটা গ্রাহক ন্যায্য মূল্যে গ্যাস পাবে।
আমদানি পরিস্থিতি ও মজুতের অভিযোগ
বাংলাদেশে এলপিজি আমদানি ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি কোম্পানি।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২/৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স রয়েছে, তবে গ্যাস আমদানি করছে ১০-১২টি কোম্পানি।
সেপ্টেম্বর মাসে গ্যাস আমদানির যে হিসাব সেখানে দেখা যায় আগের প্রায় মাসের সমপরিমাণ গ্যাস আমদানি হয়েছে। আমদানিকারকরা মজুত করে বেশি দাম নিচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে এলপিজি অপারেটরদের সবাই আমদানি করতে পারছে না
মুন্সীগঞ্জের একজন ডিলার মোজাম্মেল গ্রিন এলপিজির সরবরাহ সংকট এবং অতিরিক্ত রেট নিয়ে অভিযোগ করছিলেন।
বিষয়টি নিয়ে গ্রিন এলপিজির জিএম আহসান হাবিব হিরোর কাছে জানতে চাইলে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, গত দুই বছর গ্রিন এলপিজি কোনো গ্যাস আমদানি করছে না। অন্য অপারেটর যারা আমদানি করছে তাদের কাছ থেকে নিয়ে ফ্যাক্টরিতে বোতলজাত করে পরিবেশকদের সরবরাহ করেন।
“৫টা কোম্পানি গ্যাস আমদানি করতে পারে বাকি কেউ পারে না। দুই বছর আমরা লোকালি কিনছি তাও এখন তারা দিতে পারে না। এমন একটা অসহনীয় অবস্থায় আছি বেতন ভাতা দিতেই অসুবিধা। আমাদের দুই হাজার টন চাহিদা আমরা সেপ্টম্বর মাসে মাত্র দেড়শ টন গ্যাস পেয়েছি।”
গ্রিন এলপিজির জিএম মি. হিরো বলেন, তাদের মত আরো দশটা কোম্পানি আছে যারা অন্যদের কাছ থেকে কিনে সরবরাহ করে, আমদানি করতে পারছে না।
“ফ্রেশ আমাদের ভেন্ডর ছিল তারা দিতে পারছে না। তাদের নিজেদের ৩৫ হাজার টন চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ভেন্ডর বলছে দিতে পারবে না। জানুয়ারিতে তারা ভাববে। এখন অন্যদের কাছ থেকে নেয়ার চেষ্টা করছি, যারা দিতে পারবে তারা এক লাখ ষাট হাজার সত্তর হাজার টাকা চায়, এতে প্রতি সিলিন্ডার দুই হাজার টাকারও বেশি খরচ পড়ে।”
অর্থাৎ অপারেটর লেভেলেও অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির বিষয়টি আছে। প্রশ্ন উঠেছে সেপ্টেম্বর মাসে ১.৫৬ লাখ মেট্রিকটন এলপিজি আমদানি হলে সেই পরিমাণ গ্যাস কোথায় সরবরাহ হয়েছে।
এখানে মজুত করে অপারেটর কোম্পানি মুনাফা বাড়িয়ে নিয়েছে কি না সে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। দুএকটি কোম্পানি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গ্যাস সংকট এবং নির্ধারিত মূল্যের বাইরে গ্যাসের দাম নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ে দুই দফা বৈঠক করে এলপিজি অপারেটর কোম্পানির কর্ণধারদের সঙ্গে।
পয়লা অক্টোবর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায় সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে ১.৫৬ লাখ মেট্রিকটন এলপিজি আমদানি হয়েছে। অগাস্ট মাসে হয়েছে ১.৫৮ লাখ মেট্রিকটন।
সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, এলপিজি আমদানির কোটা বাতিল করতে হবে। এছাড়া লাইসেন্স পেতে ২৭টির মতো অনুমোদনের যে বিড়ম্বনা সেটি বন্ধ করতে হবে।
তার নিজের প্রতিষ্ঠানসহ আরো কয়েকটি অপারেটর কোটা বাড়িয়ে গত বছর নভেম্বর মাসে এলপিজি আমদানির জন্য দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই অনুমোদন দেয়নি যে কারণে আমদানির সুযোগ সীমিত হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করলে প্রিমিয়াম (আন্তর্জাতিক পরিবহন, লজিস্টিকস এবং আনুষঙ্গিক ঝুঁকি বাবদ বিমা খরচ ও আনুসঙ্গিক ফি) ৯৫ ডলার পড়তো যেটি চলতি মাসে আড়াইশ ডলার ছাড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
“২২ তারিখ থেকে মার্কেটে শর্ট। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড যে প্রাইসট্রেন্ড বাড়তেছে দেখেইতো বুঝতেছে। এবং সে জানে যে এটার প্রাইস বাড়বে। কেউ না কেউ এটা মজুত করেছে বা হোর্ডিং যেটাই বলেন না কেন। মন্ত্রণালয়ে দুই দফা মিটিং হলো। আমরা ৩০ তারিখে একটা প্রেস রিলিজ দিলাম যে আমাদের অপারেটর ডিলারস, রিটেইলার্স যেন সর্বক্ষেত্রে সবজায়গায় বার্কের প্রাইস মোতাবেক বিক্রি করে। কিন্তু আমাদের পুলিশি অভিযান নাই। আমিতো এনফোর্স করতে পারি না।”
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা আমদানি সংকট এবং মূল্য বৃদ্ধির পেছনে দায়ী বলে দাবি করছেন অপারেটররা। বাস্তবতায় হচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্পট মার্কেটে এলপিজির দামের সঙ্গে প্রিমিয়াম বা আনুসঙ্গিক খরচ বেড়েছে। এছাড়া গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পে এলপিজির চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কারণে আমদানি থাকলেও চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় একটা সংকট তৈরি হয়েছে বলেও একটা ধারণা করা হয়।
এলপিজি আমদানি থেকে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিক্রি পর্যন্ত সব পক্ষের কাছেই নানা যুক্তি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে সাধারণ গ্রাহকদের বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিবেশি দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশে গৃহস্থলীর গ্যাসে কেজিপ্রতি খরচ বেশি।
ভারতে রাজ্যভেদে এলপিজি মূল্য পার্থক্য রয়েছে। দিল্লিতে প্রতি কেজির দাম ৬৬.৩৩ রুপি বাংলাদেশের টাকায় যা ৮৪.৩৪ টাকা। কলকাতায় গৃহস্থলির গ্যাস কেজি প্রতি দাম ৬৮ রুপি বা ৮৬.৪৭ টাকা। পাকিস্তানে কেজি ২৭৯.৩৪ রুপি বা ১২৪.৩৭ টাকা।
শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ৩৪৯.২ রুপি বা ১৩০.১২ টাকা। নেপালে এলপিজি প্রতি কেজি ১৪৫ রুপি ১১৫.৫৩ টাকা।
দেশ ভেদে নীতি আমদানি সুবিধা, কার্গো এবং ভর্তুকির কারণে দামে হেরফের হয়।
বাংলাদেশে এলপিজি কিনতে খরচ সবচেয়ে বেশি
ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশে এলপিজি সেক্টরে জবাবদিহিতা এবং মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। গণশুনানি ছাড়া মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।তারপরেও নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না এ প্রশ্ন ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের।
বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে কয়েকটি অপারেটর এলপিজি আমদানি করছে যারা সৌদি সিপি দরের সঙ্গে একশ ডলারের নিচে টনপ্রতি প্রিমিয়াম দিয়ে গ্যাস আনার সুযোগ পাচ্ছে।
একই গ্যাস স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করতে প্রিমিয়াম আড়াইশ ডলারের মতো খরচ হচ্ছে।
সবশেষ মূল্য নির্ধারণের সময় প্রিমিয়া আড়াইশ ডলার ধরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ এই স্পট মার্কেট থেকে কে কতটুকু গ্যাস এনেছে সে হিসেব দিতে পারেনি বিইআরসি।
দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে যে কোম্পানি গ্যাস আনছে তারা এ মূল্য নির্ধারনে অতিমুনাফার সুযোগ পেয়েছে বলেও অভিযোগ ভোক্তাদের।
ক্যাব উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, “বিইআরসির এই বাজারের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কম্পিটিশন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। এখাতে জবাবদিহিতা নেই। বাজার রেগুলেটেড না বাজার অলিগোপলির শিকার। জ্বালানির বাজারে এলপিজি আমদানি করতে হবে। সরকারকে এলপিজি মজুত করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং এটা জরুরি। সরকার যদি নিজে বাজারে এলপিজি সরবরাহ যদি না করে তাহলে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হবে না।”
সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এলিপিজির নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করতে সারাদেশে ডিসিদের নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকরা ডিলারদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে অভিযান পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে এদিক এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানিয়েছে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে কেন সংকট হচ্ছে সেটি নিয়ে কমিটি গঠন করে। মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।




