ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে টাকা দাবী!
ষ্টাফ রিপোর্টার:
নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব রহমান রনির ভাগিনা ও ফতুল্লা থানার নিহত সৈনিক লীগের সভাপতি মোকলেসুর রহমানের পুর রিফাত এবং রনির আর্শীবাদপুস্ট ক্যাডার সালামকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেলেও রহস্যজনক কারনে তাদেরকে গ্রেফতার করছেনা পুলিশ।
সালাম শুধুমাত্র এ ঘটনাতেই যে জড়িত তা কিন্ত নয় এর আগেও চাদনী হাউজিংয়ে একটি পোশাক তৈরি কারখানার ঝুট নামানোকে কেন্দ্র করে হাৃমলার ঘটনায় মামলা হলেও সালাম রয়ে যায় অধরা। সে ঘটনায় একাধিক অস্ত্র ব্যবহার হলে ও উদ্ধার হয়নি এখনো কোন অস্ত্র। সে ঘটনায় এক মাদরাসা শিক্ষার্থী সহ দুজন গুলিবিদ্ধ হয়।সেই সালাম আবারো আলোচনায় এলো ব্যবসায়ীকে অপহরনের ঘটনায়।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এক পোশাক ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তুলে নিয়ে ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন এবং সাড়ে ৩ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী সাগর হোসেন ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনির ভাগিনা পরিচয় দেওয়া রিফাত ও তাঁর সহযোগীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। পরে বিসিকের শাসনগাঁও এলাকার ‘এম্পায়ার কটন’ কারখানার অফিসে আটকে রেখে সাগরকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মামলা করার পর থেকে হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবার।
সিসিটিভিতে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মির দৃশ্য
সাগর হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববার বিকেল পৌনে চারটার দিকে ফতুল্লার ইসদাইরের অক্টো অফিস এলাকার নিঝুম সোসাইটির একটি গলি দিয়ে সাংবাদিক বন্ধু গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে যাওয়ার সময় তাঁকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা বন্ধুকেও হুমকি দেওয়া হয়। পরে একটি প্রাইভেট কারে করে তাঁকে বিসিকের শাসনগাঁও এলাকার এম্পায়ার কটন কারখানার অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে লোহার বস্তু দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
সাগরের দাবি, তাঁকে তুলে নেওয়ার সময় অভিযুক্তদের হাতে সুইচযুক্ত ধারালো ছুরি ছিল। ছুরি গলায় ঠেকিয়ে জামার কলার ধরে তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয।নিঝুম সোসাইটির একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে এক যুবককে সাগরের গলায় ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে টেনে নিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তিকে আব্দুস সালাম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ফুটেজে রিফাতকেও দেখা যায় বলে তাঁদের দাবি।
দুবাইপ্রবাসী ভগ্নিপতিকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি
সাগরের অভিযোগ, আটকে রেখে নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ওই ফোন থেকেই হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর দুবাইপ্রবাসী ভগ্নিপতি হিরু সিকদারকে কল করে তাঁকে ছাড়ার বিনিময়ে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে থাকার পর তিনি মুক্ত হন। পরে রাতেই নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
সাগর (৩২) ফতুল্লার দেওভোগ নূর মসজিদ এলাকার শরিফ হোসেনের ছেলে। তিনি পোশাক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
মামলায় বিসিকের শাসনগাঁও এলাকার অরুণ হাওলাদারের ছেলে রাইসান রোমান (৩২), মো. আতিক ও মাসদাইরের আব্দুস সালামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা তুলে নিতে চাপ ও হুমকির অভিযোগ
সাগর ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, মামলা করার পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁদের ফোন করে হুমকি দিচ্ছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে অভিযুক্তদের পক্ষে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
সাগর বলেন, “আমাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ চেয়ে ছয় ঘণ্টা একটি অফিসে নির্যাতন করা হয়। আমি এই ঘটনায় মামলা করায় আমাকে নানান জন ফোন দিয়ে হুমকি দিচ্ছেন। আমি মানসিকভাবেও এখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। পুলিশ-প্রশাসনের কাছে আমি আমার এবং আমার পরিবারের নিরাপত্তার দাবি জানাই।”
তিনি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
রনি-ঘনিষ্ঠ পরিচয় নিয়ে আলোচনা
স্থানীয় সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত রিফাত জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনির ভাগিনা। তাঁর বাড়ি মাসদাইর এলাকায়। অন্যদিকে আব্দুস সালামও রনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত রাইসান রোমানের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার ব্যবসায়িক লেনদেন রয়েছে। ওই নেতারা রোমানের পক্ষে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে মাসদাইর এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে ভিন্ন দাবি
এদিকে, বুধবার বিকেলে এম্পায়ার কটন কারখানায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার পরিচয় দেওয়া রাসেল আহম্মেদ। তিনি দাবি করেন, সাগর ও তাঁর দুলাভাই আসাদুজ্জামান হিরুর সঙ্গে এম্পায়ার কটনের ব্যবসায়িক লেনদেন রয়েছে। পাওনা টাকা নিয়ে সমঝোতার উদ্দেশ্যে সাগর স্বেচ্ছায় কারখানাটির গাড়িতে ওঠেন বলেও দাবি করেন তিনি।
রাসেল আহম্মেদের ভাষ্য, “সাগর ও তার দুলাভাই আসাদুজ্জামান হিরুর এম্পায়ার কটন টাকা পাওনা। গত ১১ অক্টোবর খবর পাওয়া যায়, নিউ ইনডেঙ্ এঙ্সরিজও তাদের কাছে টাকা পাওনা রয়েছে। পাওনা টাকা নিয়ে সমঝোতার বিষয়ে অক্টো অফিস এলাকায় নিঝুম হাউজিং সোসাইটিতে সাগর উপস্থিত হলে সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। খবর পেয়ে এম্পায়ার কটনের মালিক রাইসান রোমান ও আতিকুল ইসলামসহ কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে পাওনা টাকা চাইলে সাগর হোসেন তালবাহানা শুরু করেন। পরে সাগর হোসেন পাওনার হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় এম্পায়ার কটনের গাড়িতে উঠে এম্পায়ার কটন ফ্যাক্টরিতে আসেন।”
তবে ভুক্তভোগীর পক্ষের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে সাগরকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। ফলে ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরোধ থাকলেও কাউকে জিম্মি করা বা নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহাবুব আলম বলেন, সাগর হোসেন প্রথমে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। মামলার তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা, মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ এবং কারখানার ভেতরে কী ঘটেছিলÑএসব বিষয়ে পুলিশের তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, এখন সেদিকেই নজর ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের।
সুত্র:সারা নারায়ণগঞ্জ




