নিজস্ব সংবাদদাতা // রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অবৈধ ইটভাটার ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পরিবেশ। ইটভাটার ধোঁয়া আশপাশের গাছপালা, ফসল ও বাড়িঘরের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। বছরের পর বছর ইটভাটার মাটি কেটে কৃষি জমি বিলুপ্ত প্রায়। অন্যের মালিকানাধীন জমি, সরকারি খাস জমির মাটি একটি সেন্ডিকেট করে দিন-রাত ২৪ ঘন্টায় বেকু লাগিয়ে ড্রামট্র্যাক দিয়ে বিভিন্ন ইটখোলায় বিক্রি করছে। জোরপূর্বক মাটি কাটার অভিযোগ রয়েছে। একাধিক দপ্তরে স্মারকলিপি ও বন্দর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও কোন সুরহা পায়নি।
এ বিষয়ে মোঃ মান্নাত মেম্বার (সাবেক) জানান, এ জমি কি আমার যে মাটি কাটবো।
অপর অভিযুক্ত লিটনকে তার মোবাইল নাম্বারে ফোন দিয়ে পাওয়া যায়নি।
সূত্রে প্রকাশ, বন্দরের নবীগঞ্জ এলাকার আবির হোসেনের স্ত্রী বাদী হয়ে মিতু আক্তার থানায় লিখিত অভিযোগ করেও কোন সুরহা পায়নি।
দাশেরগাওে বাসস্ট্যান্ডে সংলগ্ন এলাকার মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে মোঃ মান্নান (৪০),- আঃ মান্নান তালুর ছেলে হুমায়ন কবির লিটন (৪৫), মাহেসোনদের বিরুদ্ধে ২০ জানুয়ারি বিবাদীদের বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ করিতেছি যে, আমার স্বামী আবির হোসেন বিগত ১বছর পূর্বে উক্ত বিবাদীদের এলাকায় গোবিন্দকুল মৌজায় আমার নামে সি, এস ও এস, এ ১৯১ (একশত একানব্বই) নং, ও আর, এস ৫৬৪ (পাঁচশত চৌষট্টি) নং দাগে ৪২ (বেয়াল্লিশ) শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি বায়না করি। উক্ত জমি রেজিস্ট্রি বায়না করার পরে আমরা জমিতে ভোগদখলে যাই নাই জমির চারপাশে আমাদের খুটি দিয়ে জমিটি খালি পরেছিল। এই সূত্রধরে ০১ ও ০২নং বিবাদীগন বিগত ৭দিন যাবৎ বিবাদীদের অজ্ঞাত সহযোগীদের নিয়া আমার জমির মধ্য হইতে বিবাদীগন মাটি কাটতেছিল। এই প্রসঙ্গে আমার স্বামী বিবাদীদের মাটি কাটার জন্য বাঁধা প্রদান করিতে গেলে বিবাদীগন আমার স্বামীর ও আমার প্রাণ নাশের হুমকি প্রদান করে এবং বিবাদীগন আমাদের অজ্ঞাতসরে আমার জমির সীমানার খুটি তুলে ফেলে। আমার স্বামী বিবাদীদের বাঁধা প্রদান করার শর্তেও বিবাদীগন গত ৭দিন যাবৎ প্রতিনিয়ত মাটি কাটতেছে, আমার স্বামী গত ২০/০১/২০২৬ইং তারিখ বিকাল আনুমানিক ০৪.০০ঘটিকায় আবারো বিবাদীদের মাটি কাটা প্রসঙ্গে বাঁধা প্রদান করিতে গেলে বিবাদীগন আমার স্বামীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ সহ আমার স্বামীর সাথে মারমুখী আচরণ করে এবং আমার জমি আমরা কিভাবে ভোগদখল করি বিবাদীগন দেখে নিবে এই বলে হুমকি প্রদান করে। আমার জমি থেকে মাটি কাটাতে আমার জমিতে ক্ষতি হয়েছে। তাহার কারনে উক্ত বিবাদীদের কাছে সকল ক্ষতিপূরন প্রত্যাশা করছি। উক্ত বিবাদীগন খারাপ প্রকৃতির লোক যেকোন সময় আমাদের জানমালের ক্ষতিসাধন করিতে পারে। এমতাবস্থায় বর্তমানে আমি ও আমার স্বামী মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছি এবং আমাদের জীবন নিরাপত্তা-হীনতায় ভুগতেছি।
বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ ইটভাটা আইনের তোয়াক্কা না করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও প্রশাসন এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করছে না। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে আর্থিক জরিমানা করলেও পরদিন থেকেই আবারও ইটভাটাগুলো বহাল তবিয়তে তাদের কাজ শুরু করে দিচ্ছে। ফলে ওইসব এলাকার মানুষ মুক্তি পাচ্ছে না পরিবেশ দূষণের ভোগান্তি থেকে।
বন্দর উপজেলার মদনপুর, ধামগড় ও মুছাপুর ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ৫২টি ইটভাটা। এগুলোর সিংহভাগেরই নেই কোনো সরকারি অনুমোদন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া ইটভাটাগুলো বিভিন্নভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যে তিনটি ইউনিয়নে ইটভাটাগুলো চলছে, সেই তিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদেরও রয়েছে ছয়টি ইটভাটা। তাদের পরিচালিত ইটভাটাগুলোরও কোনো অনুমোদন নেই।
দাশেরগাও এলাকার ভাটাগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ভাটায় পুরোদমে চলছে ইট তৈরি ও পোড়ানোর কাজ। ইট পোড়ানোর চিমনিগুলো দিয়ে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। কালো ধোঁয়া ওই এলাকার বাতাসে মিশে মারাত্মকভাবে দূষণ করছে পরিবেশ।
বন্দর উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা ভাটাগুলোর কালো ধোঁয়ায় ওই এলাকার গাছপালা বিবর্ণ রঙ ধারণ করেছে। এখানে ফল ও ফসলেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। এ ছাড়া আশপাশের স্কুলগুলোতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বায়ুদূষণের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ওই এলাকার জাঙ্গাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নাগিনা জোহা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি স্কুল ও মাদ্রাসার কাছাকাছি একাধিক ইটভাটা থাকার কারণে এখানকার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন অভিভাবক জানান, যখন একসঙ্গে কয়েকটি ইটভাটার কালো ধোঁয়া বের হওয়া শুরু হয়, তখন শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হয় শিক্ষার্থীদের। এর প্রতিকার চেয়ে কোনো লাভ হয় না। কারণ স্থানীয় প্রভাবশালীরাই ইটভাটার মালিক। তাই ভয়ে কেউ কোনো প্রতিবাদ করেন না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি শুষ্ক মৌসুমে ওই এলাকার ইটভাটার মালিকরা প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এই ভাটাগুলো চালিয়ে থাকেন। আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন না করার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ এলাকায় কোনো ইটভাটাই এ আইন মানছে না।
উপজেলার কেওঢালা এলাকার আবদুল লতিফ জানান, ‘ইটভাটার জন্য আমাদের এলাকার ফলগাছগুলোতে কোনো ফল হয় না। এ ছাড়া সবজিও হয় না। কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালুর কারণে আমাদের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।’
বন্দর ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোমেন খান জানান, এই উপজেলার দু-একটি ছাড়া কোনো ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। জেলা প্রশাসকের অনুমোদন রয়েছে কয়েকটি ইটভাটার। পরিবেশ ছাড়পত্র না পাওয়ার কারণে লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শেখ মোজাহীদ জানান, ছাড়পত্র ছাড়াই বেআইনিভাবে চলছে ইটভাটাগুলো।




