জাগো নারায়ণগঞ্জ
নির্বাচনী হলফনামায় নিজেকে কেবল দেশি ব্যবসায়ী এবং সাধারণ সম্পদের মালিক দাবি করলেও, পর্দার আড়ালে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রূপগঞ্জের প্রভাবশালী নেতা এবং গাউছিয়া গ্রুপের কর্ণধার মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (দিপু) নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হলফনামায় বিদেশের বিপুল সম্পদ ও নাগরিকত্বের তথ্য সুকৌশলে গোপন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার ঋণ থাকলেও কানাডার টরন্টোতে রয়েছে তার ও তার স্ত্রীর নামে কোটি মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি।
হলফনামায় যা বলেছেন দিপু ভূঁইয়া
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জমা দেওয়া হলফনামায় মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া উল্লেখ করেছেন যে, বিদেশে তার কোনো সম্পদ নেই এবং তিনি অন্য কোনো দেশের নাগরিক নন। তিনি নিজেকে শতভাগ দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করে রূপগঞ্জের মানুষের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হলফনামা অনুযায়ী, তার স্থাবর সম্পদ কেবল রূপগঞ্জ ও ঢাকার কাকরাইল কেন্দ্রিক।
বাস্তবতা: টরন্টোর ‘৩ আরভিংটন ক্রেসেন্ট’
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত কানাডিয়ান প্রপার্টি ট্যাক্স বিল এবং মালিকানা দলিল (Title Information) বলছে ভিন্ন কথা। টরেন্টোর অভিজাত এলাকা ‘৩ আরভিংটন ক্রেসেন্ট’ (3 IRVINGTON CRES, Toronto, ON M2N2YB)-এ একটি বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে দিপু ভূঁইয়া ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন ইসমাইলের নামে।
মালিকানার ধরন: নথি অনুযায়ী এটি ‘জয়েন্ট টেন্যান্টস’ (Joint Tenants) মালিকানাধীন।
অর্জিত মূল্য: ২০১৫ সালে বাড়িটি ৮ লাখ ৬০ হাজার কানাডিয়ান ডলারে কেনা হয়েছিল।
বর্তমান মূল্য: বর্তমানে এই প্রপার্টির আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৩ লাখ কানাডিয়ান ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১০ কোটি টাকার উপরে)।
ট্যাক্স ফাইল: ২০২৫ সালের মে মাসে টরন্টো মিউনিসিপ্যালটির পাঠানো ট্যাক্স বিলে দেখা যায়, এই প্রপার্টির জন্য ৭,৪৫০.৩৮ ডলার ট্যাক্স ধার্য করা হয়েছে, যার মালিক হিসেবে স্পষ্টতই মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার নাম রয়েছে।
ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের শঙ্কা
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, দিপু ভূঁইয়া এবং তার প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯৩ কোটি টাকার উপরে ঋণ রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যখন দেশে শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ মাথায় নিয়ে তিনি নির্বাচনে লড়ছেন, তখন বিদেশের মাটিতে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অর্থ কোথা থেকে এল? এটি কি অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা? নির্বাচনী আইনে বিদেশের নাগরিকত্ব বা সম্পদ গোপন করা একটি গুরুতর অপরাধ, যা তার প্রার্থীতা বাতিলের জন্য যথেষ্ট।
লুকানো নাগরিকত্ব ও নৈতিকতা
কানাডায় বাড়ি কেনা এবং সেখানে নিয়মিত ট্যাক্স পরিশোধের প্রক্রিয়াটি সাধারণত দেশটির নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দাদের (PR Holder) জন্য সহজ। হলফনামায় নাগরিকত্বের তথ্য আড়াল করা কেবল ভোটারদের সাথে প্রতারণা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আইনের চরম লঙ্ঘন। একজন ‘দেশপ্রেমিক’ নেতার লেবাস পরে বিদেশের মাটিতে বিলাসবহুল জীবন নিশ্চিত করা এবং দেশের সম্পদ বাইরে পাচার করা তার রাজনৈতিক আদর্শের সাথে চরম বৈপরীত্য তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রূপগঞ্জের জনগণের সামনে নিজেকে স্বচ্ছ দাবি করলেও এই গোপন সম্পদ দিপু ভূঁইয়ার রাজনৈতিক সততাকে বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। হলফনামায় এই তথ্য গোপন রাখা কেবল নৈতিক স্খলন নয়, এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বিদেশে বিপুল সম্পদ এবং নাগরিকত্বের তথ্য গোপন রেখে তিনি কীভাবে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে দাবি করছেন, এখন সেই প্রশ্নই সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে দীপু ভূইয়ার মুঠোফোনে একাধিক কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।




