স্টাফ রিপোর্টার
সরকারি ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার ও ঘুষের অভিযোগ নারায়ণগঞ্জ জেলার ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। সরকারি পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদক সরেজমিনে পরিদর্শন, স্থানীয় সূত্র, নথি, এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে এই তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সাবেক নার্সিং সুপারভাইজার মরহুমা ফ্রানচিলিয়া গোমেজের পেনশন, ইএলপিসি, সার্ভিস স্টেটমেন্ট ও বকেয়া বেতন ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন আটকে রাখে জেলা হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। প্রথমে ফ্রানচিলিয়া গোমেজের এবং ওনার মৃত্যুর পর পরিবারের একাধিক আবেদন ইচ্ছেকৃত ভাবে উপেক্ষিত করেন ডিএও আনোয়ার হোসেন, এস এ এস সুপার মোঃ হাসান চৌধুরী ও অডিটর আনাছ আহম্মেদ আখন্দ।
সূত্রের দাবি, এ নথিপত্র ছাড়ের জন্য বড় অংকের ঘুষের দাবিও করেন এই তিন কর্মকর্তা। এমনকি এই তিন কর্মকর্তার একাধিক অডিও রের্কড রয়েছে এই প্রতিবেদক ও মরহুমা ফ্রানচিলিয়া গোমেজের পরিবারের কাছে।
এমনকি তার পরিবারের দাবি,
নথিপত্র আটকে রাখার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার দীর্ঘদিন মানসিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েছেন। পরিবার ও প্রতিবেশীদের দাবি, এসব প্রক্রিয়ার কারণে মরহুমা ফ্রানচিলিয়া গোমেজ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।
সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জের ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস অফিসার আনোয়ার হোসেনের বাড়ি সোনারগাঁও উপজেলার অর্জুন্দী গিয়ে জানা গেছে, তার পিতা শামসুদ্দিন প্রধানের অর্থনৈতিক অবস্হা খুবই খারাপ ছিলো। কোন সম্পদ ছিলো না। কিন্তু আনোয়ার হোসেন হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের অধিনে চাকরি পেয়ে যেন হাতে আলাদীনের জাদুর চেরাগ পেয়ে যান। মাত্র একটি ভাংগাচুরা তিনের ঘর প্রথমে হয়ে যায় টিনশেড বিল্ডিং। পরিবারের অন্যন্য সদস্যদের সম্পদ ক্রয় করে পুরো বাড়ির মালিক হন। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের ডিস্ট্রিক্ট একাউন্টস অফিসার হওয়ার পর সম্পদের বিস্ময়কর বৃদ্ধি পায় এই কর্মর্কতার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সোনারগাঁও উপজেলার অর্জুন্দী গ্রামে অভিযুক্ত কর্মকর্তার একমাত্র একটি টিনের ঘর ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়তলা ফাউন্ডেশনসহ বিলাসবহুল ২য় তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অর্জুন্দী ও গোয়ালদি মৌজায় আরো কয়েকটি বাড়ি ও জমি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে।
চিলারবাগ মৌজায় প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের ১০ শতাংশ বাড়ির জমি ক্রয় এবং বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা ঘনিষ্ঠজনদের নামে প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্যও পাওয়া গেছে। এছাড়াও রাজধানীর অভিজাত এলাকায় তার প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার বিষয়টি স্থানীয় সূত্রে আলোচিত হয়েছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের ছেলে আলিফকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অননুমোদিত পদ্ধতি যেমন হুন্ডি, অননুমোদিত মানি ট্রান্সফার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি—যেমন Bitcoin ও Ethereum—ব্যবহার করে শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। তার আয়ের বৈধ কোন উৎস না থাকায় পাচার করেছেন এই বিপুল অর্থ।
এছাড়াও এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা অবৈধভাবে পাঠানো অর্থ বৈধ করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিটেন্স হিসাবে তার ছেলের মাধ্যমে দেশে আনার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিটের চোখ ফাকি দিতে এ ধরনের অর্থ পাচারের কার্যক্রম অবৈধভাবে পরিচালিত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন স্হানীয়রা।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সোনারগাঁও থানা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ডেপুটি কমান্ডার ওসমান গনির মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে গরুর খামার ও শতাধিক গরু ক্রয় করে ব্যবসা পরিচালনা করেন, যার প্রকৃত মালিকানা আনোয়ার হোসেনের।
এছাড়াও, অভিযুক্ত কর্মকর্তা এক সরকারি পদে থাকা সত্ত্বেও বিগত সময়ে সোনারগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালামের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সরকারি পদ, পদবি ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে সরাসরি নির্বাচনে ভোট চান ও প্রচারনায় সরাসরি যোগ দেন এবং এই ছবি নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করেন। এমনকি বিগত সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রয়াত মোশাররফ হোসেনের পক্ষে নৌকা প্রতিকে ভোট চান এবং প্রচারনায় অংশগ্রহণ করেন এবং এই ছবি নিজের ফেসবুকে প্রকাশ ও প্রচার করেন।
সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী, এটি স্পষ্ট লঙ্ঘন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় না। এছাড়াও বিগত আওয়ামী লীগের আমলে স্হানীয় এমপি লিযাকত হোসেন খোকার নির্বাচনেও সরাসরি অংশগ্রহণ ও প্রচারনা চালান এই গুনধর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে প্রায় ১০০ ভরির উপরে স্বর্ণ এবং বিপুল পরিমাণ হীরা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এসব সম্পদ মূলত তার স্ত্রীর নামে সংরক্ষিত বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে এবং অবৈধ সম্পদ জব্দ করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। অন্যথায় এই কর্মকর্তা আরো দুর্নীতিতে উৎসাহিত হবেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।




