উন্নয়ন ও সামাজিক শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর এলাকার নবগঠিত একটি পঞ্চায়েত কমিটির বিরুদ্ধে। অনুদানের নামে প্রতিটি বাড়ি থেকে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘বাধ্যতামূলক’ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) কোনো অনুমোদন বা প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই সম্প্রতি নির্বাচনের মাধ্যমে নিশ্চিন্তপুর পঞ্চায়েত কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কমিটির কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কার্যালয় উদ্বোধনের পর থেকেই এলাকার উন্নয়ন, সিসিটিভি স্থাপন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক হারে অর্থ আদায় শুরু হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি পরিবারকে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা দিতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কারও কাছ থেকে ৫০০ টাকা, কারও কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা, আবার কারও কাছে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে। অনেকেই সামাজিক হেনস্তা ও নানা ধরনের চাপের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এটি কোনো স্বেচ্ছা অনুদান নয়। আমাদের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সামাজিকভাবে বিব্রত করার ভয় দেখানো হচ্ছে। যারা সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলছেন, তারাই এখন সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে নিশ্চিন্তপুর পঞ্চায়েত কমিটি। কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিক, সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন নাইম ও সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান প্রিন্স এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নৈশপ্রহরী নিয়োগ এবং সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বেচ্ছায় অনুদান নেওয়া হচ্ছে। কাউকে জোরপূর্বক অর্থ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না। একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) বাবুল মিয়া বলেন, “কমিটি গঠন কিংবা অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। এলাকার সাধারণ মানুষ আমার কাছে এসে অভিযোগ করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদন ছাড়া এভাবে টাকা তোলার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”
কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুও বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর আমি বিষয়টির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং অবিলম্বে অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি ছাড়া জনসাধারণের কাছ থেকে এভাবে অর্থ আদায়ের কোনো বিধান নেই। এটি সম্পূর্ণ অনিয়ম ও অবৈধ।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, “প্রশাসনের লিখিত বা মৌখিক অনুমতি ছাড়া জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও উক্ত পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান উপদেষ্টা আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “আমি সামাজিক উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যালয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। তবে সংগঠনের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোনো ধরনের জোরপূর্বক অর্থ আদায় আমি সমর্থন করি না। যদি এমন কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের উদ্দেশ্যে গঠিত কোনো সংগঠন যদি শুরুতেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি ও আইন-শৃঙ্খলার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে নিশ্চিন্তপুরের সাধারণ মানুষ প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং কেউ অনিয়ম করে থাকলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




