ফতুল্লায় ‘ছিনতাইকারী’ তকমায় জিসান হত্যা: ন্যায়ের বদলে উন্মত্ততা, আড়ালে প্রভাবশালীদের রক্ষার অপচেষ্টা
নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় ‘ছিনতাইকারী’ অপবাদ দিয়ে জিসান নামে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার অভিযোগ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি স্থানীয়ভাবে আইনের শাসন ভেঙে পড়ার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। একই সঙ্গে এ ঘটনাকে ঘিরে উঠে এসেছে সংগঠিত সহিংসতা, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং পরবর্তীতে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুস্পষ্ট প্রচেষ্টার অভিযোগ।
শনিবার (৪ জুলাই) রাত ১০টার দিকে সংঘটিত এ ঘটনায় নিহত জিসানকে তার নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় স্থানীয় একটি তথাকথিত সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, মসজিদের ইমাম কাউছার আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত ‘আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠন’-এর ৩০ থেকে ৪০ জন সদস্য জিসানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলে তাকে আটক করে। এরপর হাত-পা বেঁধে প্রকাশ্যে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, নির্যাতনের সময় মাইক হাতে নিয়ে ইমাম কাউছার আহমেদ জনতাকে উসকে দিয়ে বলেন, “পাবলিক যখন মারে, তখন কোনো অন্যায় হয় না”—এ ধরনের বক্তব্য শুধু আইনবিরোধীই নয়, বরং সরাসরি গণপিটুনিকে বৈধতা দেওয়ার সামিল। তার এই বক্তব্য জনতার মধ্যে উন্মত্ততা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়।
নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে, বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও জিসানকে ছাড়েনি হামলাকারীরা। বরং পরিকল্পিতভাবে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, এটি কোনো তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং পূর্বপরিকল্পিত একটি সহিংস কর্মকাণ্ড।
অন্যদিকে অভিযুক্ত ইমাম কাউছার আহমেদ নিজের দায় এড়িয়ে দাবি করেছেন, এলাকাবাসীর ক্ষোভ থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই কি তাকে আইনের হাতে না তুলে জনতার হাতে তুলে দেওয়া বৈধ? আর একজন ধর্মীয় নেতা কীভাবে প্রকাশ্যে এমন উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারেন?
এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশ জানায়, নিহতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে বলে জানানো হলেও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য মেলেনি।
ঘটনা ধামাচাপা নাকি নতুন কৌশল?
ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক মোড় নেয়। অভিযোগ উঠেছে, একই এলাকায় পূর্বের একটি হত্যা মামলার আসামি কাউসার কাসেমী ও জিলানী ফকিরকে রক্ষার জন্য নতুন কৌশল নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।
স্থানীয়দের দাবি, প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও এসব শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার প্রত্যাহারের দাবিতে মিছিল করানো হয়েছে। এই আয়োজনের পেছনে ‘আল ফালাহ’ সংগঠনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি কেবল অনৈতিকই নয়, বরং শিশুদের রাজনৈতিক ও অপরাধসংক্রান্ত ইস্যুতে ব্যবহার করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি হত্যাকাণ্ডের পর প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে জনমত ভিন্ন দিকে ঘোরানোর এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত পরিকল্পিত। প্রথমে একজনকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে হত্যা, এরপর সেই ঘটনার নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, এবং সর্বশেষে অন্য মামলার আসামিদের রক্ষায় জনসমর্থন তৈরির নাটক—পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত চক্রের ইঙ্গিত দেয়।
আইনের শাসন কোথায়?
ফতুল্লার এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, স্থানীয়ভাবে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করছে। অভিযোগ উঠলেই বিচার, শাস্তি—সব কিছু নিজেরাই নির্ধারণ করছে তারা। এতে করে সাধারণ মানুষ যেমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, তেমনি আইনের প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের গণপিটুনি কোনোভাবেই ‘ন্যায়বিচার’ হতে পারে না; বরং এটি সরাসরি হত্যাকাণ্ড। আর এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়বে।
দ্রুত বিচার ও জবাবদিহির দাবি
স্থানীয় সচেতন মহল জিসান হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এভাবে ব্যবহার করার ঘটনারও পৃথক তদন্ত দাবি করা হয়েছে।
প্রশ্ন একটাই—ফতুল্লায় কি আইন চলবে, নাকি উসকানিদাতাদের নেতৃত্বে চলবে ‘পাবলিক বিচার’? এই প্রশ্নের জবাব এখন প্রশাসনের কাছেই প্রত্যাশা করছে এলাকাবাসী।




