ষ্টাফ রিপোর্টার:
২৪’র জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গুলিতে নিহত রাকিব হত্যা মামলার চার্জশিট ঘিরে শুরু হয়েছে সমালোচনা। গত মার্চে আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে মৃতদের আসামি করা হলেও জীবিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ৩৫ নেতাকে অব্যাহতি দিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা নারায়ণগঞ্জ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এতে পুলিশের তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
অব্যাহতি পাওয়া নেতাদের তালিকায় থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতিও আছেন।
জানা যায়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ২০ জুলাই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের চাষাড়া অংশে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন দাপা এলাকার রাকিব। হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে নিহতের বাবা মো. মোশারফ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন ওই বছরের ২৫ আগস্ট। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১৯৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়।
চলতি বছরের মার্চে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের সিআইডি ১৬৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে মামলার চার্জশিট দাখিল করে। তবে সিআইডির দেওয়া চার্জশিট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, চার্জশিটে মৃত ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, অথচ মাঠপর্যায়ের প্রভাবশালী জীবিত আওয়ামী লীগ নেতাদের রহস্যজনকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চার্জশিটে এমন তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যারা বেশ আগেই মারা গেছেন। এরা হলেন ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মারা যাওয়া ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম সাইফুল্লাহ বাদল, একই বছরের ১০ ডিসেম্বর মারা যাওয়া কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা রোকন উদ্দিন এবং চলতি বছরের ৫ মার্চ মৃত্যুবরণ করা ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন বাবু। আসামীদের তালিকায় রয়েছে সাদ্দাম হোসেন শুভ নামে একজন সাংবাদিকও। মৃতদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করায় পুলিশের তদন্তের গভীরতা ও সততা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, আন্দোলনের সময় মাঠে সক্রিয় থাকা এবং এলাকায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা জীবিত নেতাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতি প্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সোনারগাঁ থানা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুজ্জামান মাসুদ, কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর মেম্বার, ফতুল্লা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু মোহাম্মদ শরীফুল হক, নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বি প্রান্ত, কুতুবপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আল মামুন ভূঁইয়া মিন্টু, কুতুবপুর ইউনিয়ন ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পারভেজ, প্যারাডাইস সিটি আওয়ামী লীগ ইউনিট কমিটির সভাপতি ও বিতর্কিত ক্যাডার টিক্কা, আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম চুন্নুসহ আরো একাধিক নেতা। চার্জশিটে অব্যাহতিপ্রাপ্ত নেতাদের অপরাধ প্রমাণ না হওয়া এবং ঠিকানা সঠিক না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
তবে মামলায় থেকে ফতুল্লা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু মোহাম্মদ শরীফুল হক ও তার ভাই মুন্নাসহ এমন কয়েকজন আওয়ামীলীগের নেতাদেরকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে যারা পুরো জুলাই আন্দোলনে সাবেক সাংসদ শামীম ওসমানের সাথে থেকে ও নির্দেশে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্রসহ দলবল নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারন মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে হামলা চালায়। এছাড়াও আওয়ামীলীগ নেতা জাহাঙ্গীর মেম্বার এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন। চিহিৃত আওয়ামীলীগের নেতারা কিভাবে সিআইডর তদন্তে অব্যহতি পায় সেটা নিয়েও আসামীদের পরিবার এবং সাধারন মানুষের মাঝে তৈরী হয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন।
এ বিষয়ে মামলার আসামী ও স্থানীয় অনেকেই বলছেন,যারা মোটা অংকের টাকা দিতে পেরেছে শুধুমাত্র তাদেরকেই অব্যহতি দেয়া হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে রাকিব হত্যা মামলায় সিআইডি কর্তৃক যে চার্জসিট আদালতে জমা দেয়া হয়েছে সেখানেও নাকি থানা বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার হাত রয়েছে এমনকি রাকিবের ভাইকেও নাকি উক্ত প্রভাবশালী নেতার বাড়িতে আটক রেখে সিআইডির দেয়া তদন্তে যাদের নাম দেয়া হয়েছে তারাই আসামী এবং যেসকল চিহিৃত আওয়ামীলীগ নেতাদেরকে বাদ দেয়া হয়েছে তারা এ ঘটনায় সম্পৃক্ত না মর্মেও হুমকী দেয়া হয়েছে।
চার্জশিটে মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি ইন্সপেক্টর জয়নাল আবেদীন বলেন, তদন্ত চলাকালে তারা মারা গেছেন কি না, সে ব্যাপারে আমাদের কেউ কিছু জানায়নি।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে মামলা থেকে অব্যাহতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর না দিয়ে জানান, কাগজ দেখা ছাড়া আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না।
জুলাই হত্যাকান্ডের মামলায় পুলিশের এমন কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ ও নিহতের পরিবারের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, মৃত ব্যক্তিদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে জীবিত অপরাধীদের বাঁচানোর এই অপচেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন সিআইডি কি কোনো তদন্ত ছাড়াই টেবিল টক বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত হয়ে এই চার্জশিট তৈরি করেছে?



