নিজস্ব প্রতিবেদক, সিদ্দিরগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের সিদ্দিরগঞ্জস্থ গোদনাইল বাগপাড়া এলাকায় একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে জ্বালানি মাফিয়া হিসেবে পরিচিত শাহজালাল ও তাঁর সিন্ডিকেট। একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই শাহজালাল বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ বছরে বাগিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার পাহাড় সমান সম্পদ। সাবেক প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই দোসর বর্তমানে বিদেশে থাকলেও তাঁর ভাতিজা ও দোসরদের মাধ্যমে এখনো সচল রয়েছে তেল চুরি, ভেজাল জ্বালানি তৈরি এবং মাদকের বিশাল সাম্রাজ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালেও শাহজালালের উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদ ছিল না। শামীম ওসমানের আশীর্বাদে শীতলক্ষ্যা নদী ও পদ্মা ডিপোকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলেন তেল চুরির শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বর্তমানে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় তাঁর ২৮-৩০টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। পদ্মা ডিপোতে ৩৫টি ট্যাংক লরি এবং নদীতে ২০-২২টি তেলের ট্যাঙ্কার ও বালুর ট্রলার রয়েছে তাঁর। এছাড়া জালকুড়ি বিলে রয়েছে ১০০ বিঘা জমি। শাহজালালের অবর্তমানে এই সুবিশাল সাম্রাজ্য দেখাশোনা করেন তাঁর বড় ভাতিজা মাসুম শেখ ও অনুপ শেখ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মধ্যরাত ৩টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলে এই সিন্ডিকেটের মহোৎসব। চট্টগ্রাম ও ঘোড়াশাল থেকে আসা ট্যাঙ্কার জাহাজ থেকে কেরোসিন, ডিজেল, পেট্রোল ও এটিএফ (বিমান জ্বালানি) চুরি করে বাগপাড়া জলঘাটার গোপন গোডাউনে মজুত করা হয়। পরে এসব তেলের সাথে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মিশিয়ে ‘নকল অকটেন’ তৈরি করে বিভিন্ন পাম্পে সরবরাহ করা হয়। যা যানবাহনের ইঞ্জিনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই কাজের জন্য ৫৪টি জাহাজের একটি বিশাল সিন্ডিকেট ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের জ্বালানি বহনকারী জাহাজগুলো চট্টগ্রাম থেকে ফার্নেস তেল আনার সময় সুকৌশলে বড় বড় ইয়াবা ও ফেন্সিডিলের চালান নিয়ে আসে। অনুপ শেখের নেতৃত্বে এই মাদক সাম্রাজ্য পুরো গোদনাইল ও সিদ্দিরগঞ্জ এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সিন্ডিকেট সদস্য অনুপ শেখ প্রকাশ্যেই দম্ভোক্তি করে বলেন যে, সিআইডি, ডিবি, সিদ্দিরগঞ্জ থানা ও নৌ-পুলিশকে নিয়মিত ‘মাশোয়ারা’ দিয়ে তিনি এই ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। ডিবি সোর্স আনোয়ার ও মিশুর মাধ্যমে এই অর্থের লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি এলাকাভিত্তিক কিছু রাজনৈতিক নেতাকেও এই অবৈধ আয়ের ভাগ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হয়।
পদ্মা ডিপোর আশেপাশে প্রকাশ্য দিবালোকে তেল চুরি ও ভেজাল তেলের কারবার চললেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে নানা প্রশ্ন তুলছে। তেলের এই অরাজকতায় সরকার যেমন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বাজারে ভেজাল তেলের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহল এই ‘শাহজালাল-অনুপ’ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ এবং ৩ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের জোর দাবি জানিয়েছেন।




