জাগো নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জের ৮নং ওয়ার্ডের ইব্রাহীম টেক্সটাইল মিল বালুর মাঠের কুরবানীর পশুর হাটের আত্মসাৎকৃত ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী বিএনপির ৭ জন নেতা। এর মধ্যে আপন মামা ভাগিনা ও ভাতিজা তিনজন মিলেই এবার তিনটি হাটের ইজারা নিয়েছেন। শেয়ারহোল্ডারদের এত টাকা লোপাটের পর সেই টাকা দিয়ে তারা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবেন বলে অভিযোগ তুলেছেন ওইসব ওয়ার্ডের বিএনপির নেতাকর্মীরা।
স্থানীয়রা জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জের ৮নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচনী প্রচারণায় রয়েছেন মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মমতাজ উদ্দীন মন্তু, মহানগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাগর প্রধান, যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ মোহাম্মদ অপু, মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন খোকন, মহানগর যুবদলের সদস্য আবুল বাশার বাদশা খান, জেলা তরুণ দলের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং ১০নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবেন মহানগর যুবদলের সদস্য আরমান হোসেন।
এদের মধ্যে মামা মমতাজ উদ্দীন মন্তু ৮নং ওয়ার্ডের ইব্রাহীম টেক্সটাইল মিল বালুর মাঠের হাটের ইজারাদার, ভাগিনা আরমান হোসেন ১০নং ওয়ার্ডের চিত্তরঞ্জন স্কুল মাঠ হাটের ইজারাদার ও ভাতিজা মাজহারুল ইসলাম ৬নং ওয়ার্ডের এসএম রোডের পশুর হাটের ইজারাদার। এই তিনজনের তিনটি হাটের ইজারাদার হলেও তারা আবার ৮নং ওয়ার্ডের ইব্রাহীম টেক্সটাইল মাঠের হাটের পরিচালনা কমিটিতেও ছিলেন। ভাগবাটোয়ারা করে অর্থ আত্মসাৎও করেছেন, আবার লভ্যাংশও নিয়েছেন।
এর আগে নেতাকর্মীদের অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যে ৮নং ওয়ার্ডের হাটের দুর্নীতির খবর। ৮নং ওয়ার্ডের ইব্রাহীম টেক্সটাইল মিল পশুর হাটের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা লোপাট করেছেন বিএনপির এই ৭ জন নেতার একটি সিন্ডিকেট। অভিযোগ ওঠে- শুধু তাই নয়, হাটে বিনিয়োগকারী শেয়ার হোল্ডারদের মুলধন আত্মসাতের চেষ্টা করে যাচ্ছেন নেতারা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন মাধ্যমে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
স্থানীয়রা আরো জানান, ৮নং ওয়ার্ডের ইব্রাহীম টেক্সটাইল মিলের বালুর মাঠের হাটটির সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ৪৭ লাখ টাকায় সিটি কর্পোরেশন থেকে হাটটির ইজারা পান মমতাজ উদ্দীন মন্তু। সিটি কর্পোরেশনের আহ্বানকৃত কাঙ্খিত মুল্য ছিলো ৪৫ লাখ টাকা। অথচ গত বছর এই হাটের ইজারা ছিল ১ কোটি ২১ লাখ টাকা। সেখানে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বিএনপির নেতাকর্মীদের সুবিধার্থে ৪৫ লাখ টাকায় বাজারমুল্য নির্ধারণ করে ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। যদিও সেজন্য সেখানে নাসিক প্রশাসক নিজের পকেটে ২৫ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। সেখান থেকে ধান্ধাবাজ ফটকা সাগর প্রধানও ভাগ নিয়েছেন বলেও এ নিয়েও আলোচনা সমালোচনা চলছে তুঙ্গে। সাগর প্রধানের নিয়ন্ত্রণে ৮নং ওয়ার্ডের ড্রেজার ব্যবসা। সেখান থেকেও সে মাসে কোটি টাকা নিজের পকেটে ভরছেন।
এদিকে এই ৮নং ওয়ার্ডের হাটটিসহ ১০নং ওয়ার্ডের চিত্তরঞ্জন মাঠের হাট পরিচালনার দায়িত্ব নেন সিন্ডিকেটের একই কমিটি। দুটি ওয়ার্ডের নেতারা মিলিত হয়ে দুটি হাট পরিচালনা করেন। যেখানে চিত্তরঞ্জন হাটের ইজারা পান মন্তুর ভাগিনা আরমান হোসেন। দুটি হাটের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব। ঈদ শেষে ইব্রাহীম টেক্সটাইল মিলের হাটে ৭৬ লাখ টাকা লভ্যাংশ এবং চিত্তরঞ্জন হাটে সাড়ে ৫ লাখ টাকা লোকসান দেখান মামা ভাগিনা।
কিন্তু এই ঘটনার অন্তরালে ঘটে গেছে বিরাট দুর্নীতির ঘটনা। যেখানে ইব্রাহীম টেক্সটাইল মিলের হাটে হাসলি আদায় করা হয় ৫ হাজার পশুর। যেখানে মোট হাসলি আদায় হয় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। কিন্তু হাট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সভাপতি মাসুকুল ইসলাম রাজীব, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সহ-সভাপতি ডিএচ বাবুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাধীন, মমতাজ উদ্দীন মন্তু, সাগর প্রধান, শেখ মোহাম্মদ অপু, দেলোয়ার হোসেন খোকন, মহানগর যুবদলের সদস্য বাদশা খান ও আরমান হোসেন দেড় হাজার পশুর হাসলির মুড়ি বই সরিয়ে ফেলেন। যেখানে প্রায় দেড় কোটি টাকা তারা লোপাট করে ফেলেন।
ইজারাদার মন্তু নেতাকর্মীদের কাছে দাবি করেছেন, সাড়ে ৩ হাজার হাসলি কাটা হয়েছে। তার দেয়া হিসেবেই সাড়ে ৩ কোটি টাকা হাসলি ওঠেছে। কিন্তু পৌনে তিন কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে মন্তু দাবি করছেন মাত্র লভ্যাংশ হয়েছে ৭৬ লাখ টাকা! নেতাকর্মীরা হিসেবে চাইতে পারে সেই ভয়ে এই সিন্ডিকেটের সকলেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। মন্তুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। শুধু লভ্যাংশই তারা ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা লোপাট করে এখন শেয়ার হোল্ডারদের বিনিয়োগকৃত টাকা ফেরত দিচ্ছেনা। অর্থ লোপাট ও আত্মসাত নিয়ে ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি সামুসউদ্দীন শেখ, সিদ্ধিরগঞ্জ স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ হুমায়ন কবির, যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন সানি সহ নেতাকর্মীরা ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ দূর্নীতিবাজদের বিচার দাবি করছেন।
নেতাকর্মীরা বলছেন, দেড় হাজার হাসলি সরিয়ে দেড় কোটি টাকা ও পরবর্তীতে আরো ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি লোপাট করেছেন এই সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য সাগর প্রধান ঈদের দুদিন আগেই রাতের আধারে এক ট্যাংক টাকা নিয়ে অন্যত্র চলে যান বলে স্বেচ্ছাসেবীরা দেখতে পান। তবে এ বিষয়ে মাসুকুল ইসলাম রাজিব মুঠোফোনে স্থানীয় অনলাইনকে বলেছিলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি মিউচুয়াল করে দিয়েছি।যারা অভিযোগ করেছে তাদের আসতে বলেন। সামনা সামনি কথা বলে জেনে তারপর যা করার কইরেন।’
এ বিষয়ে মমতাজ উদ্দিন মন্তু বলেছিলেন, ‘অভিযোগের সত্যতা কি? যারা পুঁজি দিছে আমি ও রাজিব ভাই লভ্যাংশের টাকা দিয়ে দিছি। ২/৪ জন আছে যারা পুঁজি না দিয়ে লভ্যাংশ চায়। তারা গ্রাম ভরে বলে বেড়াচ্ছে টাকা দেই নাই। আপনি সত্যতা যাচাই করেন।’ সাগর প্রধানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি। যদিও তিনি নিউজ প্রকাশের পর রাজীব ও মন্তুর উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে দুর্নীতির আভাস দিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, হাটের একক নিয়ন্ত্রক ছিলেন মন্তু। তিনি কারো কোন পরামর্শ নেননি। গতবার ১ কোটি ২১ লাখ টাকা দিয়ে হাট নেই। তখন প্রত্যেক অংশীদারকে ১০ হাজার টাকা লভ্যাংশ দেয়া হয়েছিল। কিছু জানতে চাইলে মন্তু ও রাজিব ভাইয়ের কাছে জানতে পারেন। তারা সমস্ত লেনদেন করেছেন।’




