জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এ পর্যন্ত সাতটি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ২২ জন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২২ জনের মধ্যে ১৮ জন পলাতক এবং চারজন কারাগারে রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল–২–এর সর্বশেষ রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ২২ জনে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয়জন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তাদের অনুপস্থিতিতেই এ মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়।
এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের সপ্তম রায়।
সাত মামলার রায়ে ৬৮ জন দণ্ডিত
ট্রাইব্যুনালের প্রথম ছয়টি রায়ে মোট ৬১ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে পৃথক ব্যক্তি হিসেবে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। তবে মোট মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ছিল ১৬টি। কারণ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান চানঁখারপুল ও রামপুরা–বনশ্রী হত্যাকাণ্ড—দুটি মামলাতেই মৃত্যুদণ্ড পান।
সপ্তম রায়ে আরও সাতজনের মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় এখন মোট দণ্ডপ্রাপ্তের সংখ্যা ৬৮ এবং পৃথক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ২২।
যে সাত মামলায় রায়
শেখ হাসিনা মামলা: ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হাসিনা ও কামালের বিচার তাদের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়।
চানঁখারপুল হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং সাবেক এডিসি শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আরও পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে তিন থেকে ছয় বছরের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আশুলিয়া হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানো: ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা–১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়াসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য চার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হলেন এএফএম সায়েদ, আব্দুল মালেক, বিশ্বজিৎ সাহা ও মুকুল চোখদার। এ ছাড়া নয়জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে সাতজনকে যাবজ্জীবন এবং দুজনকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রামপুরা–বনশ্রী হত্যাকাণ্ড: ২০২৬ সালের ২৮ জুন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
হাসানুল হক ইনু মামলা: ২০২৬ সালের ৩০ জুন জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
ওবায়দুল কাদের মামলা: ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জন
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জন হলেন—শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, মো. সাইফুল ইসলাম, রনি ভূঁইয়া, হাবিবুর রহমান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম, এএফএম সায়েদ, আব্দুল মালেক, বিশ্বজিৎ সাহা, মুকুল চোখদার, আমির হোসেন, সুজন চন্দ্র রায়, মো. রাশেদুল ইসলাম ও মো. মশিউর রহমান।
হাবিবুর রহমান চানঁখারপুল ও রামপুরা–বনশ্রী হত্যাকাণ্ড—দুই মামলাতেই মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মৃত্যুদণ্ড হলেও পৃথক ব্যক্তি হিসেবে ২২ জনের হিসাবের মধ্যে তাকে একবারই গণনা করা হয়েছে।
১১ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মী রয়েছেন ১১ জন। তারা হলেন শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, সাইফুল ইসলাম ও রনি ভূঁইয়া।
বাকি ১১ জন পুলিশ কর্মকর্তা।
কারাগারে চারজন, পলাতক ১৮
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামির মধ্যে বর্তমানে চারজন কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন আশুলিয়া মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল মালেক ও মুকুল চোখদার এবং আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায়।
অন্য ১৮ জন পলাতক রয়েছেন।




