দুবার সরকার বদলের পরও ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা বলয় ভাঙা যায়নি। তেলের বাজারে এখনো চলছে সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং ডা. এজাজুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের দাপট।
বাংলানিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি সরকারের নতুন উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত করতে কাজ করছে আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও জ্বালানি খাতের সুবিধাভোগী একটি চক্র ওই সিন্ডিকেটকে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও পুরনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে এ খাতকে পুনর্গঠন করতে কাজ করছেন।
তবে সরকারেরই একটি সুবিধাভোগী চক্র ঠিক উল্টো অবস্থান নিয়েছে। এতে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিন্ডিকেট চাইছে, নতুন সরবরাহকারীরা যাতে সহজে বিপিসির জ্বালানি আমদানির বাজারে ঢুকতে না পারে। তাদের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সিন্ডিকেট চাইছে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নিজেদের হাতে রাখতে, বিপিসির ভেতরে থাকা পুরনো চক্রকে কাজে লাগানো এবং সংকটকালীন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে নির্ধারিত কিছু জ্বালানি সরবরাহে অপারগতা জানায় এজাজসংশ্লিষ্ট বিদেশি সরবরাহকারীরা। আবার নতুন দরপত্রে কয়েক মাসের ব্যবধানে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায় প্রিমিয়াম। ফলে সরকারকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহে সংকট কিংবা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত তার দায় বর্তমান সরকারের ওপর পড়বে।
আর অস্থিরতার আড়ালে থেকে যাবে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা পুরনো চক্র। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার বদলের পরও কেন থেকে যাচ্ছে এই পুরনো ব্যবস্থা?
বিপিসির নথি, দরপত্র, কার্যাদেশ এবং জ্বালানি খাতের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি খাতে অস্থিরতার নেপথ্যের নানা তথ্য।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১১টি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর অন্তত ৬টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের। সেগুলো হলো—সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেড। সেভেন মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি)-জাপিন।
অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড (পিটিএলসিএল), পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েল।
সূত্র বলছে, কাগজে-কলমে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী ৬টি আলাদা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশে এসে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের বড় অংশের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে একই ব্যক্তির দুই প্রতিষ্ঠানে।
বিপিসির দরপত্র ও কার্যাদেশ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মোট ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টনের কার্যাদেশ গেছে এমন প্রতিষ্ঠানের কাছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে ডা. এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে, যা মোট কার্যাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ।
সরকার বদলানোর পর পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় সর্বশেষ জুন-আগস্ট মেয়াদের দরপত্রে। নথিতে দেখা যায়, তিন মাসের জন্য ৪টি প্যাকেজে ৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১১ লাখ ৫০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি।
প্যাকেজ পিজি-১-এ তিন লাখ ২০ হাজার থেকে তিন লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ইউনিপেক সিঙ্গাপুর।
পিজি-২-এ তিন লাখ থেকে তিন লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল এবং ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া। পিজি-৩-এ দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ট্রাফিগুরা। পিজি-৪-এ ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় আবারও ভিটল এশিয়া।
চার প্যাকেজের ৩টির কার্যাদেশ পাওয়া ইউনিপেক ও ভিটল—এই দুটি প্রতিষ্ঠানেরই স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব ডা. এজাজের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। এই ৪টি প্যাকেজে সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ লাখ টন জ্বালানি আমদানিতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
নসরুল হামিদ বিপুর হাত ধরে এজাজের উত্থান
বিপিসির বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে খুলে যায় ডা. এজাজুর রহমানের ভাগ্যের দুয়ার। তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। ধীরে ধীরে জ্বালানি তেল আমদানিতে তার অবস্থান শক্ত হতে থাকে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বিপিসির আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেন এজাজ। একে একে হাতে চলে আসে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সরাসরি যোগসূত্রে আরো শক্ত হয় সেই বলয়।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে বদলে যায় অনেক কিছু। কেবল বদলায়নি জ্বালানি খাতে এই আওয়ামী চক্রের দাপট। অন্য অনেক খাতের মতো জ্বালানিতে আওয়ামী বলয় ভাঙার আশা করলেও এখনো টিকে রয়েছে সেই চক্রটি।
চক্রটি নিজেদের স্বার্থে জ্বালানি খাতকে অস্থির করে রাখার বিপরীতে অনেক ঝুঁকিও তৈরি করে রেখেছে। বিপিসির নথিতে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় ডা. এজাজের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নির্ধারিত সময়ের কিছু অর্ডার সরবরাহে অপারগতা জানায়। বিষয়টি বিপিসির বোর্ডসভার কার্যবিবরণীতেও আসে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আমদানি করা জ্বালানির বড় অংশ যদি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং সেগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিত্বও একই বলয়ের হাতে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক সংকটের সময় ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ কয়েকটি সরবরাহকারী একসঙ্গে পিছিয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদে উন্মুক্ত দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৪.৭২ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ৬.৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে কার্যাদেশ পেয়েছিল। একই সময় ভিটল এশিয়ার ডিজেলের প্রিমিয়াম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৪.৭৮ ডলার এবং জেট ফুয়েলের ৬.৮৮ ডলার।
কিন্তু জুন-আগস্ট মেয়াদের নতুন দরপত্রে এই হার এক লাফে অনেক বেড়ে যায়। ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ১৩.২৫ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ১৪.৮৬ ডলার প্রিমিয়াম প্রস্তাব করে। ভিটলের প্রস্তাব ছিল যথাক্রমে ১৩.১৮ ও ১৪.৭৮ ডলার।
বিপিসি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজভাড়া, বীমা ও সরবরাহ ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে প্রিমিয়াম বৃদ্ধির একটি যৌক্তিক আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এই বৃদ্ধির পুরোটাই কি আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে, নাকি সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতারও প্রভাব রয়েছে?
সরকারের উদ্যোগ, বাধা ভেতরেই!
সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে উঠতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও খাতটি পুনর্গঠনের কথা বলে আসছেন। সরকারের লক্ষ্য, জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়ানো, প্রতিযোগিতা তৈরি করা এবং কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
কিন্তু সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই বিপিসির ভেতরে প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে কাজ করে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের একটি অংশ পুরনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিপিসি এবং এর অধীন তেল বিপণন কম্পানিগুলোর বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা অবসরের পর ডা. এজাজের প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তাদের কেউ বিপিসিতে তেল ক্রয়-বিক্রয়, কেউ বিপণন, কেউ আন্তর্জাতিক সরবরাহ কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এমন সাবেক কর্মকর্তার সংখ্যা অন্তত ১০। যমুনা অয়েল কম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে যে ভবনে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ অফিস, একই ভবনে রয়েছে ডা. এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিপিসির সাবেক কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ব্যবসায়িক সুবিধা তৈরিতে কাজে লাগছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নথিতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির নামে বিপিসির জন্য আসা কয়েকটি জ্বালানি চালান ইন্দোনেশিয়া থেকে নয়, এসেছে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে। তবে তৃতীয় দেশের বন্দর থেকে পণ্য আসা অনিয়মের প্রমাণ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না এবং তার পক্ষে কী নথি দেওয়া হয়েছিল। সেই নথি যাচাই করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি দরপত্র প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিযোগিতায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন, সেটি গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।



