॥ কাজী আনিসুল হক ॥
জুলাই শেষ হয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, ঋতুও বদলেছে। কিন্তু কিছু কিছু মাস কখনো শেষ হয় না। তারা মানুষের ভেতরে বাসা বাঁধে। জুলাই আমার কাছে তেমনই এক মাস—যে মাস এখনও প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে, দীর্ঘশ্বাস হয়ে বুকের ভেতর জমে থাকে।
আমি প্রায়ই ভাবি—আন্দোলন কী? গণঅভ্যুত্থানই বা কী? আর বিপ্লব? রাজপথে মানুষের ঢল, স্লোগানের উত্তাপ কিংবা ক্ষমতার পালাবদল কি একটি বিপ্লবের পূর্ণ পরিচয়? নাকি বিপ্লব তখনই ঘটে, যখন মানুষের ভাগ্য বদলায়, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়, অন্যায়ের বদলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, আর ক্ষমতার বদলে জবাবদিহি মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে?
জুলাইয়ের দিনগুলোতে মানুষ দল-মতের হিসাব করেনি। তারা স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নে ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, যেখানে নাগরিকের পরিচয় হবে তার অধিকার, দলীয় পরিচয় নয়; যেখানে রাষ্ট্র মানুষের হবে, ক্ষমতার নয়।
কিন্তু সময় বড় নির্মম আয়না। সেই আয়নার সামনে দাঁড়ালে আজ প্রশ্ন জাগে—সেই স্বপ্নের কতটা বাস্তব হয়েছে? পরিবর্তনের যে সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তার আলো কি সত্যিই সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছেছে?
ইতিহাসের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। মানুষের রক্তে লেখা আন্দোলন অনেক সময় রাজনীতির খাতায় নতুন হিসাব হয়ে যায়। জনতার কাঁধে ভর করে ক্ষমতার সিংহাসনে ওঠা সহজ; কিন্তু জনতার স্বপ্নকে সম্মান করা কঠিন। তাই আন্দোলনের প্রকৃত পরীক্ষা রাজপথে নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায়।
আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব-এই তিনটি শব্দ শুধু অভিধানের সংজ্ঞা নয়; এগুলো জাতির আত্মপরিচয়েরও অংশ। আন্দোলন দাবি তোলে, গণঅভ্যুত্থান অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনতার সম্মিলিত প্রতিবাদ হয়ে ওঠে, আর বিপ্লব সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত পাল্টে দেয়। বিপ্লবের সাফল্য ক্ষমতা দখলে নয়, মানুষের জীবনের পরিবর্তনে।
আজ ‘জুলাই ২০২৪’-কে কেউ আন্দোলন বলছেন, কেউ গণঅভ্যুত্থান, আবার কেউ বিপ্লব। হয়তো ইতিহাসই একদিন এর যথার্থ নাম নির্ধারণ করবে। কারণ ইতিহাসের রায় তাৎক্ষণিক হয় না; সময়ের আদালতে তার বিচার হয়।
আন্দোলনের দিনগুলোতে যে জনসমুদ্র সৃষ্টি হয়েছিল, আজ সেই মানুষের মনেই নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন বক্তব্য, রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রকাশিত তথ্য নতুন নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, সত্য অনুসন্ধান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে দিতে হবে। কারণ সত্যকে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।
স্বাধীনতার ইতিহাস, রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা কিংবা জাতীয় পরিচয় নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধার পাল্লায় ওজন করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। ইতিহাস কোনো দলের সম্পত্তি নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি।
সবচেয়ে বড় বেদনা-রক্তের রং কখনো দল দেখে না। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, শিশু রিয়া গোপ, নিহত পুলিশ সদস্য কিংবা অন্য যে-ই হোন না কেন, প্রতিটি প্রাণের মূল্য সমান। প্রতিটি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু অপরাধীকেই সাহসী করে না, রাষ্ট্রকেও দুর্বল করে।
দুর্নীতির প্রশ্নেও মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু নানা গবেষণা ও জনমতের আলোচনায় এখনও সেই পুরোনো অসুখের কথাই ফিরে আসে। সরকার বদলালেই যদি ব্যবস্থার পরিবর্তন না হয়, তবে মানুষের হতাশা আরও গভীর হয়। কারণ দুর্নীতি কেবল অর্থের লেনদেন নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস চুরির আরেক নাম।
নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। নতুন প্রতিশ্রুতিও এসেছে। এখন মানুষের অপেক্ষা বক্তৃতার জন্য নয়, বাস্তবতার জন্য। আইন প্রণয়নের চেয়ে আইনের ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগই রাষ্ট্রকে মর্যাদা দেয়। জনগণ প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফল দেখতে চায়।
জুলাই আমাদের একটি স্মৃতি দিয়ে যায়নি, একটি দায়িত্ব দিয়ে গেছে। সেই দায়িত্ব হলো- যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, তার কাছে জবাবদিহি দাবি করা। কোনো ব্যক্তি, দল বা মতের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; সত্য, ন্যায় এবং মানুষের অধিকারের প্রতি অবিচল থাকা।
কারণ ইতিহাসের শেষ বাক্য রাজনীতিবিদ লেখেন না, ক্ষমতাবানও লেখেন না। ইতিহাসের শেষ বাক্য লেখে সাধারণ মানুষ। তাই জুলাইয়ের প্রকৃত মূল্যায়নও হবে তখনই, যখন তার স্বপ্ন মানুষের জীবনে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও মর্যাদার বাস্তব রূপ হয়ে উঠবে।
অন্যথায় একদিন ইতিহাস নীরবে প্রশ্ন করবে-জুলাই কি সত্যিই মানুষের মুক্তির নতুন অধ্যায় ছিল, নাকি মানুষের আবেগকে রাজনৈতিক ফসলে পরিণত করার আরেকটি ঋতু?
হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও লেখা হয়নি। হয়তো উত্তরটি লিখবে আগামী প্রজন্ম। কিন্তু আজকের আমাদের দায়িত্ব একটাই-যে স্বপ্নের জন্য মানুষ পথে নেমেছিল, সেই স্বপ্নকে যেন ক্ষমতার করিডোরে হারিয়ে যেতে না দিই। কারণ স্বপ্ন একবার ভেঙে গেলে তা আবার দেখা যায়, কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে কঠিন কাজ।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক।




