রাজধানীর গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকা। গতকাল শনিবার বিকেল। কালো রঙের একটি গাড়ি এসে থামল। দরজা খুলে বের হলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। পরনে পাঞ্জাবি, ডান হাতে একটি যন্ত্র মুখের কাছে নিয়ে কিছু বলছিলেন, আর তাঁর বাঁ হাতে পিস্তল। কিছু এগিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘এই ধর ধর ধর …।’ তাঁর পাশ থেকে আরেকজন বলছিলেন, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’
আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গুলি ছোড়ার ভয় দেখিয়ে প্রতিমন্ত্রী দৌড়াচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরাও কয়েকজনকে ধরতে দৌড়াচ্ছেন। এর মধ্যে এক ব্যক্তিকে পেয়ে লাথিও দিতে দেখা যায় এক দেহরক্ষীকে।
এভাবে আইন ভেঙে অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁর পক্ষ থেকে এটিকে মাদকবিরোধী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে ইশরাক তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ ঘটনার ভিডিও আপলোড করেন। এর পর বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। আইনজ্ঞরা এ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন।
ফেসবুকে প্রতিমন্ত্রী যে ভিডিও আপলোড করেছেন তার শিরোনাম– ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’। এতে দেখা যায়, ইশরাক অস্ত্র হাতে গাড়ি থেকে নামার পর তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে অবস্থান করা কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। এ সময় কয়েকজন যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ প্রতিমন্ত্রী তখন বলেন, ‘পুলিশ আসবে, তারপর কথা হবে।’
এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলু ছিলেন। পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষী ছিলেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। সরকারি দেহরক্ষীকে অস্ত্র তাক করতে দেখা যায়।
এলাকার লোকজন জানান, শনিবার ইশরাক হোসেন রেললাইন-সংলগ্ন বস্তিতে মাদকের আস্তানায় আকস্মিক অভিযান চালান । এ সময় মাদক ব্যবসায় জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এর আগেও এই আসনের বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির সংবাদমাধ্যমকে বলেন, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ছয়জনকে আটক করে থানায় ফোন দেন। পরে থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা গিয়ে তাদের নিয়ে আসেন। ওসি বলেন, আটক ব্যক্তিদের কাছে সাদা পাউডারজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে। সেগুলো হেরোইন কিনা, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ কিনা? পাশাপাশি বৈধ হলেও এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা আইনসম্মত হয়েছে কিনা? আইনজ্ঞরা বলছেন, একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগের প্রধান বা নীতিনির্ধারক মাত্র। মাঠ পর্যায়ে সরাসরি পুলিশি অভিযান পরিচালনা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো বিশেষ ক্ষমতা সংবিধান বা ফৌজদারি কার্যবিধি তাদের দেয়নি।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৬’ অনুযায়ী বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রদর্শনীবাজি বা হয়রানি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অপরাধী ধরার জন্য বা কোনো আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত অস্ত্র প্রকাশ্যে উঁচিয়ে অভিযান চালানো এই নীতিমালার পরিপন্থি এবং এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
উচ্চ আদালতের আইনজীবী তাওহীদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা-২০২৫-এর ২৫ (ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিজের লাইসেন্সের বিপরীতে নেওয়া অস্ত্র শুধু আত্মরক্ষার জন্য বহন ও ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যের ভীতি বা বিরক্তি তৈরি হতে পারে এমন ক্ষেত্রে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অপরাধে অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা অনূর্ধ্ব ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
জানতে চাইলে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা সমকালকে বলেন, আইন অনুযায়ী মূলত আত্মরক্ষার প্রয়োজনে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন করা যেতে পারে। কোনো অভিযানে গিয়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শন না করাই ভালো। কারণ, তাঁর নিরাপত্তার জন্য তো পুলিশ থাকার কথা।
অভিযান শেষে ইশরাক বলেন, ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। মাদক ব্যবসায়ীরা যে দলেরই হোক, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। বিএনপির কেউ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকলে তার শাস্তি আরও বড় হবে।
অস্ত্র প্রদর্শন বিষয়ে জানার জন্য সমকালের পক্ষ থেকে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ফোনে কল দিয়ে এবং হোয়াটসআপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তিনি অন্য গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ। ২০২৫ সালে ডিসেম্বরে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর লাইসেন্স করে আগ্নেয়াস্ত্রটি নিয়েছেন।
তবে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হলফনামায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করেননি ইশরাক।
অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদক ব্যবসা হয়। এলাকার মানুষ বারবার তাঁর কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে তিনি সেখানে গেছেন।
সমকাল




