নারায়ণগঞ্জে আইনের শাসনের করুণ অবস্থা: অপহরণ, চাঁদাবাজি আর ভয়ের নগরীতে পরিণত হচ্ছে জনপদ
স্থানীয়ভাবে ন্যায়বিচার না পেয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন—আইনশৃঙ্খলার ভাঙনের জ্বলন্ত উদাহরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ—একসময় শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ এখন ক্রমেই রূপ নিচ্ছে ভয়ের জনপদে।
রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় পরিচয় আর দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সুযোগে এখানে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এর সর্বশেষ ও উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে জমি ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন দিলুর অভিযোগ।
স্থানীয় প্রশাসনের ওপর আস্থা হারিয়ে একজন ভুক্তভোগী যখন নিজের এলাকায় দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পান না, তখন তাকে বাধ্য হয়ে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব-এ গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে হয়—এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়, বরং পুরো জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, তাকে পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা অপহরণ করে আটকে রাখে এবং পরবর্তীতে নগদ অর্থ ও চেক আদায় করে। তার ভাষ্যমতে, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন জুয়েল আরমান, যিনি ফতুল্লা থানা কৃষকদলের আহবায়ক।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ মে রাতে ফতুল্লার তক্কার মাঠ এলাকা থেকে তাকে তুলে নিয়ে প্রথমে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়।
পরে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হুমকি দিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে তিনি আট লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন—যার মধ্যে তিন লাখ টাকা নগদ এবং পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক ছিল।
এই ঘটনা আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, ভুক্তভোগী এর আগেও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত রাজধানীতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনের পথ বেছে নেন। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, স্থানীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচারের পথ কতটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত জুয়েল আরমান অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি একটি জমি লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেলোয়ার হোসেন পূর্বে জমির বায়না হিসেবে অর্থ দিয়েছিলেন, যার একটি চেক পরবর্তীতে ডিজঅনার হয়। সেই বিরোধের জের ধরেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যদি এটি শুধুই বাণিজ্যিক বিরোধ হয়ে থাকে, তাহলে কেন একজন ব্যক্তি নিজ এলাকায় বিচার না পেয়ে রাজধানীতে গিয়ে অভিযোগ তুলবেন ?
কেন তিনি স্থানীয় থানায় গিয়ে নিরাপদ বোধ করেননি ?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নারায়ণগঞ্জে আইনের শাসন কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধের বিস্তার এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে সাধারণ মানুষ দিন দিন আস্থা হারাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর।
উপসংহার:
নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। যদি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই জনপদে আইনের শাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এখনই সময়—দোষীদের আইনের আওতায় এনে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করার।




