ষ্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার চার বছর ধরে নিম্নমুখী। দারিদ্র্য ও বৈষম্যের হারও টানা চার বছর বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। নাজুক প্রবণতা থেকে বের হতে পারছে না আর্থিক খাত। সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের বিনিয়োগই কমছে। জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও দুর্বল। তাই চলতি অর্থবছরে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী থাকবে।
‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ বা ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন হালনাগাদ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার সংকট, ব্যাংকিং খাতে ভঙ্গুর পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতির উত্তরণের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে জরুরি সংস্কারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের পাশাপাশি একই বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ওপর প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের প্রতিবেদনের ওপর বক্তব্য রাখেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা ও নাজমুস সাদাত খান। সঞ্চালনা করেন সিনিয়র যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরীন আহমেদ মাহবুব।
বিশ্বব্যাংক সাধারণত বছরে দুবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেওয়া চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ছয় মাসে অর্থনীতির হালচাল বিশ্লেষণ করে এখন ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আগে থেকে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আয়, জ্বালানি খাতের অদক্ষতা ও দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ। তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া এবং বৈশ্বিক চাহিদার মন্দাও অন্যতম কারণ।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধি
অর্থনীতির ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য পরিস্থিতির ওপর। প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বল শ্রম চাহিদা ও অব্যাহত মূল্যস্ফীতির চাপে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হচ্ছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি আরও বেগতিক করেছে। জ্বালানি সংকট কারখানা বন্ধ ও কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা নিয়োগকে সীমিত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক ৩ ডলারের কম ভোগব্যয় থাকলে কোনো ব্যক্তি দারিদ্র্যসীমার আওতায় পড়েন। বিশ্বব্যাংকের তৈরি এই মানদণ্ডে চার বছর ধরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে। প্রতিবেদনে করা বিশ্বব্যাংকের অনুমান বলছে, গত অর্থবছরে এ রকম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ২১ লাখ বেড়েছে। ২০২২ সালে এই মানদণ্ড অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ বলে বিশ্বব্যাংক প্রাক্কলন করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর বিবিএসের নতুন কোনো জরিপ প্রকাশিত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন হলো- ২০২২ এর পর প্রতিবছরই দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ২২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে নামতে পারে।
দারিদ্র্যের সঙ্গে বৈষম্যের সম্পর্ক নিবিড়। বৈষম্য পরিমাপ করা হয় জিনি সহগ দিয়ে। এ হার যত কম বৈষম্য তত কম। প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছরে বৈষম্য আরও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী গত অর্থবছর জিনি সূচক শূন্য দশমিক ৯ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ৯ পয়েন্ট। ৪ বছর আগে ২০২২ সালের মাত্রার চেয়ে বেড়েছে ৪ পয়েন্টের বেশি।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশ জ্বালানি ও সার ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষায় বছরে জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু এর বড় অংশ সঠিক মানুষের কাছে যাচ্ছে না। ২০২২ সালে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশ পেয়েছে, অথচ ভর্তুকির ভার গরিব পরিবারের আয়ে অনেক বেশি। দরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে ছিল সবচেয়ে গরিব ২০ শতাংশ পরিবারের ৬২ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি জমির মালিক ২০ শতাংশ পরিবার সারে দেওয়া ভর্তুকির অর্ধেক পেয়েছে।
জ্বালানি সংকট ও শিল্পের ধীরগতি
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট অর্থনৈতিক স্থবিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ডলার সংকটের কারণে এলএনজি ও কয়লা আমদানিতে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাব শ্রমবাজারে পড়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারিয়ে অনেক নারী শ্রমশক্তির বাইরে চলে গেছেন। ক্যাপটিভ পাওয়ার পরিচালনায় বাড়তি খরচ শিল্প খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
এতে বলা হয়, জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধে সরকারের ওপর বিপুল আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা সার্বিক বাজেটের স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার চেয়ে কম চলেছে বা বন্ধ ছিল, ব্যাপক লোডশেডিংও হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। গত অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম আমদানি ব্যয় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা কভিডের পর প্রথম। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের পুনরুদ্ধার পিছিয়ে যাবে
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির ধারা অব্যাহত
বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন কেবল সাময়িক কোনো সমস্যা নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ১০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনধারণ কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে দেশে তার প্রভাব পড়েনি। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে গত অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বিদ্যুতের গড় খুচরা দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এতে কম আয়ের শ্রমিকের মজুরি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন। চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। অবশ্য, আগামী অর্থবছর তা কমে ৭ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নাজুক
বিশ্বব্যাংক বলেছে, আর্থিক খাতের ঝুঁকি ও দুর্বলতা তীব্রতর হয়েছে এবং ক্রমবর্ধমান পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করছে। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যাপক মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে গত জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিআরএআর) গত বছরের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ১০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণমূলক সর্বনিম্ন সীমার বহু নিচে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক খাতের সংস্কার অগ্রগতির গতি এখনও মন্থর। ব্যাংক নিষ্পত্তি আইন অ্যাক্ট এবং আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও নিয়ন্ত্রণমূলক শিথিলতা ও বারবার তারল্য সহায়তা ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্রের সংস্কার বিলম্বিত করছে। বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এবং অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যাংক পুনর্গঠন ও খেলাপি ঋণ নিরসনে দ্রুত ও সময়াবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে বলা হয়, দ্রুত সম্পদের মান পর্যালোচনা শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। লোকসানের দায় মালিক ও বিনিয়োগকারীদের বহন করতে হবে এবং নিয়ম শিথিলতা ধাপে ধাপে তুলে নিতে হবে। সুদহারের ব্যবধানের সীমা তুলে নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, জ্বালানি খাতে দেশি গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রকল্প বাছাই ও বিদ্যুৎ কেনায় স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র দরকার। রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে বলা হয়, কর নীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয় করে কর ফাঁকি শনাক্ত করতে হবে এবং অকার্যকর কর ছাড় ধাপে ধাপে কমাতে হবে। সর্বজনীন ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংক একদিকে সৌরবিদ্যুতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানিতে ঋণ দিচ্ছে কেন- সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নের জবাবে কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, বর্তমান সংকট নিরসনে আপাতত এলএনজি আমদানিতে সহায়তা দিচ্ছেন তারা। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের সমাধানে নিজস্ব সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে।




