ষ্টাফ রিপোর্টার:
বৃদ্ধা মা-বাবার ভরণপোষণ না করা, অপমান-অপদস্থ, শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের পর তার ছেলে মোহাম্মদ হোসেনের ওপর হামলা করে রক্তাক্ত জখম করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় জাকির হোসেন, মনির হোসেন ও নূর মোহাম্মদ জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার পুলিশ লাইন সংলগ্ন গাবতলী টাগারপাড় এলাকায় ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মোসা: মাসুদা বেগম, স্বামী জামাল উদ্দিন, পুলিশ লাইন টাগারপাড়, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। তিনি জানান, তার চার ছেলে। এর মধ্যে জাকির হোসেন (৫০) ও মনির হোসেন (৪০) তার আপন ছেলে। পারিবারিক সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে বণ্টনের পর থেকে ওই দুই ছেলে মা-বাবার ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ তার।
মাসুদা বেগমের দাবি, প্রয়োজনের সময় তাদের কাছে সহযোগিতা চাইলে উল্টো খারাপ আচরণ, অপমান-অপদস্থ এবং বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার জন্য টাকা চাইতে গেলে জাকির হোসেন ও মনির হোসেন তাকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এর পরদিন ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে তার ছেলে মোহাম্মদ হোসেন অটো চালানোর উদ্দেশ্যে গাবতলী টাগারপাড় এলাকায় জাকির হোসেনের দোকানের সামনে পৌঁছালে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, জাকির হোসেন ও মনির হোসেন মোহাম্মদ হোসেনকে এলোপাতাড়ি মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। একপর্যায়ে তাকে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন।
পরে স্থানীয় লোকজন আহত মোহাম্মদ হোসেনকে চিকিৎসার জন্য খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। পরিবারের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার নথি সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মাসুদা বেগম আরও অভিযোগ করেন, হামলার ঘটনার পর মামলা বা অভিযোগ করলে তাকে, তার স্বামী এবং ছেলে মোহাম্মদ হোসেনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে পরিবারটি বর্তমানে চরম ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগে নূর মোহাম্মদ নামের একজনের বিরুদ্ধেও ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, আহত মোহাম্মদ হোসেন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়ও নূর মোহাম্মদ সেখানে উপস্থিত হয়ে হুমকি দিয়েছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গতকাল সন্ধ্যার পর বাড়িতে দফায় দফায় হামলার অভিযোগ
পরিবারটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যার পর কয়েক দফায় একদল লোক তাদের বাড়িতে এসে হামলা চালায় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় তারা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বলেÑ“আইনি ব্যবস্থা নিলে খবর আছে, দেখে নেওয়া হবে।”
পরিবারের দাবি, এ ঘটনার পর তারা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। এ বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
তবে বাড়িতে হামলার ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত ছিল এবং ঘটনার সঙ্গে জাকির হোসেন, মনির হোসেন বা নূর মোহাম্মদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি নাÑতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আগেও থানায় একাধিক অভিযোগের দাবি
মাসুদা বেগমের দাবি, জাকির হোসেন ও মনির হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগেও ফতুল্লা থানায় চার-পাঁচবার অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ করার পরও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে বলে অভিযোগ তার।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মনির হোসেনের একজন সম্বন্ধী নিজেকে পুলিশের সঙ্গে পরিচিত বা পুলিশ সদস্যের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। এ ধরনের প্রভাব দেখিয়ে তাদের শায়েস্তা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসআই নুরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা
অভিযোগে উল্লিখিত পুলিশ-পরিচয় বা সম্পর্কের বিষয়টি যাচাই করতে এসআই নুরুজ্জামান-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার/প্রতিবেদক পক্ষ। তাকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তার বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের পুলিশ-সম্পর্কিত অংশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়/সম্পর্কের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
মনির হোসেনকে ঘিরে আরও অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজনের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে মনির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নারীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ এবং কলমিস্ত্রির কাজের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে প্রতারণা বা চুরির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনের সময় কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
এ ঘটনায় বৃদ্ধা মাসুদা বেগম তার ও স্বামীর ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ছেলে মোহাম্মদ হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
তিনি আহত মোহাম্মদ হোসেনের চিকিৎসার নথি যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ, ঘটনাস্থলের তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা এবং পূর্বে ফতুল্লা থানায় করা অভিযোগগুলোর বিষয়েও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর বাড়িতে হামলার অভিযোগটিও তদন্ত করে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পরিবারটির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, ভবিষ্যতে যাতে কোনো ধরনের হামলা, নির্যাতন বা প্রাণনাশের হুমকির ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য: প্রতিবেদনের জন্য জাকির হোসেন, মনির হোসেন ও নূর মোহাম্মদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে এসআই নুরুজ্জামানের সঙ্গেও একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়; তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
প্রতিবেদকের নোট: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো ভুক্তভোগী পরিবার ও অভিযোগকারীর বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো বিচারিক বা প্রশাসনিকভাবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসা নথি, পূর্বের অভিযোগের রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা জরুরি।




