ভারতের স্বার্থ রক্ষা এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে পিলখানা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল— এমন অভিযোগ তুলেছেন বিডিআর হত্যাকাণ্ডে শহীদ সদস্যদের পরিবারের প্রতিনিধিরা। তাদের বক্তব্য, এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যেসব কর্মকর্তা ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়, তাদের উদ্দেশে ভয় বা সতর্কবার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া ক্লাবে ‘বিডিআর তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশে শহীদ পরিবারের মতপ্রকাশ’— শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তোলেন নিহত সাবেক বিডিআর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ ভূঁইয়া।
রাকিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘বার্তাটা ছিল এমন—সেনাবাহিনীতে কেউ ভারতবিরোধী হলে তার পরিণতি হবে পিলখানার মতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে শহীদ কর্নেল কুদরুতী ইলাহীর ছেলে সাকিব রহমান বলেন, ‘কমিশন জানিয়েছে, কিছু নাম আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না। আমাদের আশঙ্কা, এই কারণ দেখিয়েই হয়তো সেই নামগুলো আর প্রকাশ করা হবে না। শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে আমরা তা মেনে নিতে পারি না।’ তিনি আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
শহীদ কর্নেল মুজিবুল হকের ছেলে মুবিন হক বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছি। আওয়ামী লীগ এবং তাদের ঘনিষ্ঠ কিছু অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা আমাদের মানহানি করেছেন এবং সম্মিলিতভাবে অপপ্রচার চালিয়েছেন বলে আমরা মনে করি। শহীদ পরিবারকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’ তিনি সরকারকে শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
শহীদ নূরুল ইসলামের সন্তান পরিচয়ে আশরাফুল আলম হান্নান দাবি করেন, ‘বিগত সরকার একটি মিথ্যা ইস্যুকে সামনে এনে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার সূচনা করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের মানুষ জানে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা ছিল— আমাদের বিশ্বাস, এতে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা এবং ভারতের সংশ্লিষ্টতা ছিল।’ তার অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কারণে তিনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।
এদিকে, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। এ ঘটনার সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা এবং ভারতের সম্পৃক্ততাও পেয়েছে কমিশন।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরির বিআরআইসিএম নতুন ভবনের সপ্তম তলায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান।
এর আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার নাম বলেন। তাঁরা হলেন—ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিদেশে পলাতক শেখ ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাহারা খাতুন।
এর বাইরে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করেন তদন্ত কমিশনের প্রধান আ ল ম ফজলুর রহমান। তারা হলেন—শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল আকবর (মোল্লা ফজলে আকবর)।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দুই মাসের মধ্যেই এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।




