নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এখন আর সাধারণ মানুষের এলাকা নয়—এটি কার্যত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে। বিশেষ করে মাসদাইর ও কাশিপুর যেন আইনের বাইরে এক আলাদা রাষ্ট্র, যেখানে প্রশাসনের উপস্থিতি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে চলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নির্দেশ—“তাদের কথাই আইন”।
চট্টগ্রামের আলোচিত ‘জঙ্গল সলিমপুর’-এর সঙ্গে এখন সরাসরি তুলনা টানা হচ্ছে মাসদাইরের। পার্থক্য শুধু নামের—অবস্থা একই, বরং কোথাও কোথাও আরও ভয়াবহ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে গেলে উল্টো হামলার শিকার হচ্ছে, গুলির মুখে পড়ছে। প্রকাশ্যে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, আর পরে তা ধামাচাপা দিতে চলছে নানা নাটক।
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ফতুল্লা আজ অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত। কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তাণ্ডব, মাদকের অবাধ বিস্তার, জমি দখলের উন্মাদ প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ কার্যত জিম্মি। বিসিক শিল্পাঞ্চল ঘিরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে গড়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট। এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ককটেল বিস্ফোরণ, প্রকাশ্যে গুলি—সবই এখন নিয়মিত ঘটনা।
সম্প্রতি মামলা তুলে নিতে বাদীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। তার আগে সিজান নামের এক যুবককে বাসা থেকে তুলে এনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়—যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। কিন্তু এসব ঘটনার পরও অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে—বরং আরও বেপরোয়া।
ইমন হত্যা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে বাদীর বাসায় ঢুকে কুপিয়ে, গুলি ছুড়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। এতে স্পষ্ট—এলাকায় আইন নেই, আছে শুধু সন্ত্রাসীদের শাসন।
অপরাধের আরেক ঘাঁটি কাশিপুর। বিশেষ করে বাঁশমুলি এলাকা এখন মাদকের বড় আড্ডাখানা। বাইরের অপরাধীরা এখানে এসে অপরাধ করে সহজেই গা ঢাকা দিচ্ছে। এমনকি পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে—যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুল মাদক, অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরঞ্জাম উদ্ধার হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী পরিবর্তন নেই। জমি দখল, ফিটিংবাজি ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে আগের মতোই।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও পেশিশক্তির জোরে কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন তাণ্ডবে ফতুল্লাবাসী আজ চরম আতঙ্কে। অন্যায়ের প্রতিবাদ মানেই ঝুঁকি—প্রাণনাশের আশঙ্কা এখন নিত্যসঙ্গী।
স্থানীয়দের ক্ষোভ স্পষ্ট—“এটা কোনো সভ্য সমাজ হতে পারে না। আমরা যেন সন্ত্রাসীদের দয়ার ওপর বেঁচে আছি।” তাদের দাবি, লোক দেখানো অভিযান নয়—মূল অপরাধচক্র ভেঙে ফেলার মতো কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফতুল্লাবাসীর শেষ আর্তি—আইনের শাসন ফিরিয়ে আনুন, নইলে এই এলাকা পুরোপুরি অপরাধীদের নিয়ন্ত্রিত অন্ধকার জোনে পরিণত হবে।




