ষ্টাফ রিপোর্টার:
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত ও সমালোচিত শব্দ হলো হাজি সাব এবং ভাইজান। বিগত ১৭ বছর আলোচিত হাজি সাবের নামে-বেনামে তার বাহিনীর সদস্যরা পুরো জেলা জুড়েই তান্ডব চালিয়েছিলো। আর ৫ আগষ্টের পর নতুনভাবে আর্বিভাব হয়েছে ভাইজানের। একজন ছিলেন নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের সাবেক সাংসদ প্রয়াত নাসিম ওসমানের একমাত্র তনয় আজমেরী ওসমান আর বর্তমান জন হচ্ছেন সাবেক ছাত্রদলের সভাপতি জাকির খান।
এরা দুইজনই কিন্তু একই হাতেগড়া দুই শীর্ষ আতংকের নাম। আজমেরী ওসমানের প্রয়াত বাবা নাসিম ওসমানের হাত ধরেই রাজনীতির ক্যারিয়ার গড়ে উঠে জাকির খানের। একজন হচ্ছে ঔরসজাত সন্তান আর অপরজন হচ্ছে শিষ্য।
হাজি সাবের দিন শেষ হয়েছে ৫ আগষ্ট আর ভাইজানের দিন শুরু হয়েছে ৫ আগষ্টের পর থেকে। মোটকথা হাজি সাব ও ভাইজান একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দুইজন দুই ভুবনের বাসিন্দা হলেও তাদের উভয়ের কাজ কিন্তু একই আদলে পরিপুর্ন। চাদাঁবাজি,ভুমিদস্যুতাসহ নানাবিধ অপরাধের স্বর্গরাজ্যের অন্যতম সেনাপতি আজমেরী ওসমান ও জাকির খান। স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির চেয়ে তাদের বলয়ে লোকজন বেশী। আর এ বেশী লোকবলের বলয় দিয়েই পুরো জেলা জুড়েই রয়েছে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার।
হাজি সাব খ্যাত আজমেরী ওসমান ছিলেন নারায়ণগঞ্জে একটি মুর্তিমান আতংক। দেশ ছেড়ে পলায়নের পর সেই আতংকের রেশ কাটতে না কাটতে আরেক নতুন আতংকে রুপ নিয়েছে জাকির খান। আজমেরী ওসমানের পথ অনুসরন করে হুবুহু সেই আদলেই নানা প্রকার অপরাধ কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে জাকির খান ও তার বাহিনীর সদস্যরা। আজমেরী ওসমানের মতই বিশাল গাড়ি ও হোন্ডা বহর নিয়ে শহর ও শহরতলীর বিভিন্নস্থানে গিয়ে সাধারন মানুষের মাঝে আতংক ছড়াচ্ছেন ভাইজানখ্যাত জাকির খান।
তবে শান্তিকামী মানুষ কিংবা ব্যবসায়ী সমাজের কাছে এ দুটি নাম হচ্ছে আতংকের একটি নাম। একজন ৫ আগষ্টে পর পালিয়ে গিয়ে দুবাইয়ে অবস্থান করলেও তার বাহিনীর বেশীরভাগ সদস্য এখন ভাইজান খ্যাত জাকির খানের বলয়ে প্রবেশ করে পুর্বের ন্যায় বর্তমানেও চালাচ্ছে অপরাধের স্বগ্যরাজ্যে। ভুমি কিংবা নদীর বালু উত্তোলন,পরিবহন কিংবা বাসষ্ট্যান্ড দখল,ফুটপাতে চাদাঁবাজি কিংবা অটো-মিশুকে চাদাঁবাজি,বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনে নিজস্ব ব্যক্তিরা পরিচালনাসহ কোন কিছুতেই পিছিয়ে নেই ভাইজান খ্যাত জাকির খান ও তার বাহিনীর সদস্যরা।
৫ আগষ্টের পর জাকির খান ও তার বাহিনীর কর্মকান্ডে নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি স্থানেই সাধারন মানুষ অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছে তাদের অব্যাহত অপরাধের কারনে। এ যেন অঘোষিত একটি সরকার দলের ক্যাডার বাহিনীর নিয়ন্ত্রন।
তবে চাঁদাবাজি মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত জেলখাটা জাকির খান ও তার নেতৃত্বাধীন ‘খান বাহিনী’ এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারিতে রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে চাঁদাবাজি, ভূমিদখল, মাদক ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল এই বাহিনী।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে জাকির খানসহ বাহিনীর সক্রিয় সদস্যদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে একটি বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা।
একই সাথে কে কি এবং কোন পন্থায় কি কি অপকর্ম করতে পারেন তার বিস্তারিত তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। একই সাথে জাকির খানের সার্বিক ঘটনা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সূত্র জানায়, খান বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। কোনো বিরোধ দেখা দিলে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে “মীমাংসা”র নামে অর্থ আদায় করাই ছিল তাদের প্রধান কর্মকান্ড। সম্প্রতি কয়েকজন ভুক্তভোগী সাহস করে অভিযোগ দায়ের করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, যারা এই বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত, তাদের কেউই আইনের আওতার বাইরে থাকবে না। ইতিমধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে।
একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জাকির খান ও তার সহযোগীদের দীর্ঘদিনের কর্মকান্ড আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। তাদের আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক সংযোগ এবং অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ চলছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ হাতে এলেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে এলাকাবাসী প্রশাসনের এ পদক্ষেপে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, “খান বাহিনীর কারণে এলাকায় দীর্ঘদিন ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছিল। এখন পুলিশ সক্রিয় হওয়ায় মানুষ আশার আলো দেখছে।”
তবে শহর ছাড়িয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে জাকির খানের বাহিনীর সদস্যরা সাধারন মানুষের কাছে একটি আতংকের নাম। নিজ জমিতে বালু ভরাট কিংবা বাড়ি নির্মান কোন খাতেই বাদ নেই যে তাদেরকে টাকা ছাড়া দেয়া সম্ভব করা যাচ্ছে। এক গাড়ি বালু দুই বাড়িতে ভাগ করে দিয়ে দুই বাড়ির মালিকের কাছ থেকে দুই ট্রাক বালুর মুল্য আদায় করছে আবার ৩ হাজার ইটের পরিবর্তে ২৮ শত ইট দিয়ে ৩ হাজারের মুল্য রাখছে। তারপরও গাড়ি প্রতি ২/৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে বাড়ির মালিককে। জাকির খান ও তার বাহিনীর সদস্য যা করে যাচ্ছে যা বিগত সময়ে থাকা স্বৈরাচারী সরকার দলের কোন সদস্য তা করেনি এমনটাই অভিমত স্থানীয়দের।
প্রসঙ্গত, জাকির খান একসময় স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। সেই সুযোগে প্রভাব বিস্তার করে তিনি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার বেশ কিছু সহযোগী গা-ঢাকা দিলেও, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে।




