ষ্টাফ রিপোর্টার:
নির্বাচন এলেই তিনি হয়ে যান গেম অথবা কিং মেকার। ফতুল্লার রাজনীতির এক কালো অধ্যায়ের নাম মোহাম্মদ আলী। আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও জাতীয়পার্টি সব অঙ্গনেই ছিল তার সরব পদচারণা। গিরগিটির মতই রং পাল্টানো যার হবি। স্বার্থ হাসিলে বিবেক বিসর্জনে তিনি কখনোই পিছ পা হয়নি কখনো। জাতীয়পার্টির সময় তিনি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের ছোট ভাই, বিএনপির সময় দলের নিবেদীত প্রাণ আর আওয়ামীলীগের সময় দলীয় প্রধানের আস্থা ভাজন সব শাখাতেই ছিল তার সরব পদচারণা। ফতুল্লার মানুষকে আর কত ধোকা দিবেন মোহাম্মদ আলী।
ফতুল্লা একটি হাসপাতাল ও একটি কলেজ নির্মানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওয়াদা ভঙ্গকারী বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী। সময়টা ছিল ১৯৯৫ সাল। ফতুল্লা ডিআইটি মাঠে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আগমন। আর খালেদা জিয়ার আগমনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী। যদিও সে সময় নারায়ণগঞ্জ -৪ আসনের এমপি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধ কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম, সদা সহজ, সরল স্পষ্ট ভাষী কমান্ডার সিরাজ তার সরলতা ও স্পষ্ট ভাষার কারনে রাজনৈতিক ভাবে কোনঠাসা করে ফেলেন নিজ দলীয় নেতা-কর্মীরা। তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি রোকন উদ্দীন মোল্লা ও অধ্যাপক মাজেদুর ইসলামের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে দিসেহারা হয়ে পড়েন কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম তখন স্বরানাপন্ন হন ভাগিনা মোহাম্মদ আলীর।
যদিও ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিএনপির প্রার্থী কমান্ডার সিরাজুল ইসলামের নিকট বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। তারপরও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে মাত্র ১৫ দিনের এমপি হয়ে এখনও পর্যন্ত সেই খেতাব বহন করে চলছেন। বিগত আওয়ামীলীগের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি ওসমান পরিবারের ঘনিষ্টজন হিসেবে ছিলেন ব্যাপক প্রভাবশালী। যার প্রভাবের ফলে বিগত সময়ে তিনি ব্যাপক অনিয়ম করলেও তা পার পেয়ে যান ওসমান পরিবারের আর্শীবাদের কারনে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি চেয়েছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হতে। কিন্তু সেটা কজ¦া করতে পারেনি। বিএনপি জোট থেকে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি রিপাবলিকান পার্টি হতে নির্বাচন করছেন হাতি প্রতিক নিয়ে। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে যে, বিএনপির মনোনয়ন ব্যর্থ হয়ে ওসমান পরিবারের আর্শীবাদে তিনি এবার যে নির্বাচন করছেন তার পেছনে রয়েছে সেই ওসমানীয় জগতের সকল নেতাকর্মীরা। কেউবা আওয়ামীলীগের রানিং কমিটির নেতাকর্মী আবার কেউবা বিগত কমিটির নেতাকর্মীরা।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ ৪ এই আসনকে ঘিরে চলছে ব্যাপক সমালোচনা, গুঞ্জন ও বিতর্ক যার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন এক বিতর্কিত চরিত্র হচ্ছে মোহাম্মদ আলী; যিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘নয় লাইখ্যা ব্যাংক ডাকাত’ নামে।
স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বললেও বাস্তবে এই নির্বাচনী মাঠে এমন সব প্রার্থী হাজির হচ্ছেন, যাদের অতীত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা। মোহাম্মদ আলী তাদের অন্যতম।
*‘**নয় **লাইখ্যা **ব্যাংক **ডাকাত’ **তকমার **ইতিহাস*
ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় এখনো আলোচিত একটি নাম—মোহাম্মদ আলী। স্বাধীনতার পর আদমজী মিলের প্রায় নয় লাখ টাকা লুটের ঘটনায় ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে তার নাম
ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সেই ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘নয় লাইখ্যা ব্যাংক ডাকাত মোহাম্মদ আলী’ নামে।
সমালোচকদের দাবি, তিনি ছিলেন একটি ডাকাত দলের সরদার। যদিও এই প্রজন্মের অনেকেই সেই ইতিহাস জানেন না, তবে পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি এখনো ‘খোলা গোপন রহস্য’।
*কিং **মেকার **নাকি **কিং **জোকার ?*
নির্বাচনের মাঠে নিজেকে ‘কিং মেকার’ হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন মোহাম্মদ আলী। ফতুল্লার অনেক বাসিন্দার ভাষ্য, তিনি কিং মেকার নন, বরং ‘কিং জোকার’। কারণ, একের পর এক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্যতা এবং সুযোগসন্ধানী ভূমিকা তার রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
*প্রতীক **বদল, **অবস্থান **বদল*
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই নারায়ণগঞ্জ জুড়ে ধানের শীষের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে ছেয়ে ফেলেন মোহাম্মদ আলী। তবে বিএনপি তাকে প্রার্থী হিসেবে মূল্যায়ন না করায় শেষ পর্যন্ত তিনি হাতির প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামেন। এই প্রতীক বদলকেও অনেকেই রাজনৈতিক ভন্ডামির আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
*মুক্তিযোদ্ধা **পরিচয় **নিয়েও **প্রশ্ন*
সমালোচকদের মতে, স্বাধীনতার আগে ৭০ এর দশকে মোহাম্মদ আলী ছিলেন একজন সাধারণ লেবার। স্বাধীনতার পর নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করলেও তার এই দাবির পক্ষে
গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এ নিয়ে এখনো প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক চলমান।
*মামলা, **পলায়ন **ও **পুনর্বাসনের **অভিযোগ*
ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এরশাদ আমলে প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে মামলার জট কাটানোর অভিযোগও ওঠে।
পরবর্তী সময়ে কখনো জাতীয় পার্টি, কখনো বিএনপির নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় আসে ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে যেখানে তিনি হঠাৎ করেই সংসদ সদস্য হয়ে ওঠেন। তখন থেকেই ‘নয় লাইখ্যা ডাকাত সরদার’-এর নামের পাশে যুক্ত হয় ‘সাবেক সংসদ সদস্য’ পরিচয়।
*ওসমান **পরিবারের **ছায়াতলে **১৫ **বছর*
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মোহাম্মদ আলী ওসমান পরিবারের আশ্রয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর নানা কর্মকান্ড চালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অনেকেই তাকে ওসমান পরিবারের ‘খয়ের খা’ হিসেবে আখ্যা দেন। এই সময়কালে তার প্রভাব, সম্পদ ও দাপট বহুগুণে বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
*জামায়াত **থেকে **আওয়ামী **লীগ**সবখানেই **উপস্থিতি*
নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেও জামায়াত নেতা মাওলানা মইন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক ও ঘনিষ্ঠতার ছবিও আলোচনায় এসেছে। এবারের নির্বাচনে পলাতক শামীম ওসমানের
ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে নিয়ে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে পাশে রেখে বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহর সঙ্গে তার প্রকাশ্য প্রচারণা। অথচ শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনায় একাধিক মামলার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক বিএম শফিক,থানা আওয়ামীলীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মাহবুবুল হক মাসুদসহ কয়েক শতাধিক আওয়ামী দোসররা শামীম ওসমানের হয়ে মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে দেখা গেছে। অথচ এদের অনেকের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় বৈষম্যবিরোধী মামলাও রয়েছে।
*পরিবারকেন্দ্রিক **অপরাধ **সাম্রাজ্যের **অভিযোগ*
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোহাম্মদ আলীর পরিবারের সদস্যরা চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যবসা ও তেল চুরিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। এসব কার্যক্রম এখনো ‘বীরদর্পে’ চলমান বলেও দাবি করা হয়। তার ভাতিজা সাইদুর রহমান রিপন তিতাস এন্টারপ্রাইজের নামে ফতুল্লা মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপোর নিয়ন্ত্রন করছেন তেলচোর সিন্ডিকেট। এই তেলচোর সিন্ডিকেট ট্যাংকলড়ি ও নদীপথে ট্রলারের মাধ্যমে হাজার হাজার লিটার সরকারী তেল চুরি করে আসছে। পাশাপাশি তার নিয়ন্ত্রনে যমুনা ও মেঘনা ট্যাংকলড়ি থেকে শ্রমিক ইউনিয়নের নামে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা চাদাবাজি করছে। রিপনের চাদাবাজি চক্রের অন্যতম হোতা ট্যাংকলড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন যমুনা শাখার সভাপতি রহমতউল্লাহ ভান্ডারী,সাধারন সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ। মেঘনা শাখার সভাপতি মো.বাচ্চু মিয়া ও মো.শাহীন অন্যতম। তার আরেক ভাতিজা হাবিবুর রহমান লিটন কুখ্যাত ভুমিদস্যু হিসেবে ব্যাপক সুপরিচিত। বিভিন্ন নিরীহ মানুষের জমি দখল ও ইটভাটা মালিকদের কাছে বিপুল পরিমানে চাদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
ওসমান পরিবারের এজেন্ডা ?
পঞ্চবটি এলাকার একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, মোহাম্মদ আলী মূলত নির্বাচন করছেন না জনগণের জন্য তিনি মাঠে নেমেছেন ওসমান পরিবারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। তাদের মতে, ওসমান পরিবারের বৈধ-অবৈধ সম্পদ রক্ষা এবং নিজের অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখাই এই নাটকীয় নির্বাচনের মূল লক্ষ্য।
*প্রশ্ন **থেকেই **যায়*
সব অভিযোগ, বিতর্ক ও গুঞ্জনের ভিড়ে একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের ভোটাররা কি আবারও মোহাম্মদ আলীর মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে তাকে নির্বাচিত ওসমান পরিবারকে পুর্নপ্রতিষ্ঠান পাশাপাশি তার আশপাশে থাকা ভুমিদস্যু-মাদক সন্ত্রাসী-তেলচোরসহ নানাবিধ অপরাধীদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। নাকি ‘নয় লাইখ্যা কিং জোকার’-এর রাজনৈতিক নাটকের ইতি ঘটাতে যাচ্ছেন, নাকি এবার তারা ইতিহাস জানার পর নতুন সিদ্ধান্ত নেবেন ?




