-
কালেরকন্ঠে প্রকাশিত সংবাদটি জাগো নারায়ণগঞ্জের পাঠকদের জন্য হুবুহু প্রকাশ করা হলো:
- ৯ মাসে বাহিনীর ৪০ সদস্য আহত
- হামলাকারীদের লক্ষ্য আতঙ্ক সৃষ্টি
নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। মাদকবিরোধী অভিযান, আসামি গ্রেপ্তার কিংবা সাধারণ টহল কার্যক্রম- যেকোনো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা অপরাধীদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছেন।
গত ৯ মাসে এ ধরনের ঘটনায় বাহিনীর অন্তত ৪০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। সরকারি অস্ত্র ছিনতাই এবং গ্রেপ্তার আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীন বোধ করছে।
সাম্প্রতিক হামলা
গত ৫ মে জেলার ফতুল্লার মাসদাইর বয়ালিয়া খাল এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় র্যাব-১১ এর একটি দল। র্যাবের দাবি, স্থানীয় একদল সশস্ত্র ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এতে এসআই নাজিবুল, কনস্টেবল মাহি ও ইব্রাহিম আহত হন। গুরুতর আহত নাজিবুলকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তবে পাল্টা অভিযানে র্যাব বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পিস্তলের গুলি, ছুরি, চাপাতি, রামদা, চাইনিজ কুড়াল, গাঁজা ও ইয়াবা।
এ সময় ১৩ জনকে আটক করে র্যাব।
এর আগে গত ৫ মে ভোরে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরোয়ানাভুক্ত আসামি শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। একদল লোক পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ধরে হামলা চালায়। এতে রূপগঞ্জ থানার ওসিসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। হামলাকারীরা পুলিশের একটি ওয়াকিটকি এবং দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।
এ সময় পালিয়ে যায় আসামি শামীম মিয়া। পরে কেন্দ্রীয় যুবদল শামীম মিয়াকে বহিষ্কার করে এবং পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে তার স্ত্রীসহ ১২ জনকে আটক করা হয়।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে ৬ মে ফতুল্লার দেওভোগ হাশেমবাগ এলাকায়। চাঁদাবাজি ও লুটপাটের দায়ে তিনজনকে আটক করে থানায় নেওয়ার পথে একদল দুর্বৃত্ত পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিদের ছিনিয়ে নেয়। এতে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আটক ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পথে কয়েকজন বাধা দেয়। তারা আসামিদের ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। জড়িতদের শনাক্ত করতে আমরা কাজ করছি।’
এর আগে, গত ৩০ এপ্রিল বন্দর উপজেলার হাবিব নগর এলাকায় ছিনতাইয়ের তদন্ত করতে গিয়ে হামলার শিকার হন মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই সোহেল রানা ও কনস্টেবল ফয়সাল হোসেন। ১৪ থেকে ১৫ জনের একটি দল তাদের ওপর হামলা চালালে কনস্টেবল ফয়সাল গুরুতর আহত হন। তাকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সন্ত্রাসীরা পুলিশের কাছ থেকে একটি সরকারি শটগান ছিনিয়ে নিলেও পরে তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে, শহরের ভেতরও নিরাপদ নয় পুলিশ। গত ১৫ মার্চ উকিলপাড়া রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ সদস্যদের মারধর করে এবং তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় আসামিরা। এ সময় দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তৎপর হয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে।
তার আগে গত ৯ মার্চ নিতাইগঞ্জ এলাকায় টহলরত অবস্থায় শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির এক কর্মকর্তার সরকারি পিস্তল ছিনতাই করা হয়। এ সময় আহত হন তিনি। পরে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার ও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অপরাধীদের দুর্গ: জিমখানা ও চনপাড়া বস্তি
নারায়ণগঞ্জ শহরের জিমখানা বস্তি ও রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তি এলাকা এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। এই এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার রক্ত ঝরিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। জিমখানায় গত বছরের ২২ অক্টোবর আসামি ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতের শিকার হন মদনগঞ্জ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য কামরুজ্জামান। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ২৮ ডিসেম্বর মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে আবারও হামলার শিকার হয় পুলিশের একটি দল। এতে পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। একইভাবে রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তিতেও আসামি ধরতে গিয়ে বারবার বাধার মুখে পড়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার এই প্রবণতা কেবল শহরে নয়, উপজেলা পর্যায়েও চলছে। চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আড়াইহাজারে ওয়ারেন্টভুক্ত এক নারী আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকে পুলিশের দলটি। এ সময় ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেয় তার সহযোগীরা।
গত বছরের ঘটনাগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। ২৯ অক্টোবর আড়াইহাজারের মারুয়াদী এলাকায় গ্রাম্য বিরোধ থামাতে গিয়ে আক্রান্ত হয় পুলিশ। দুর্বৃত্তরা আড়াইহাজার থানার ওসির সরকারি ডাবল কেবিন পিকআপ গাড়িটি ভাঙচুর করে। এ সময় ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে র্যাব এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছিল গত সেপ্টেম্বরে সোনারগাঁর বৈদ্দেরবাজার খেয়াঘাট এলাকায়। হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি মহসিনকে হাতকড়া পরা অবস্থায় পুলিশ নিয়ে যাওয়ার সময় ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়। এতে ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং স্থানীয় এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পুলিশ হাতকড়া উদ্ধার করলেও আসামিকে আর গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্যই তারা পুলিশের ওপর হামলা করছে, যাতে এলাকায় নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল রাশেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্যই তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টার্গেট করছে যাতে জনগণ মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে না পারে। পাশাপাশি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কিছু ষড়যন্ত্রকারীও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে এ ধরনের কাজ করে যাচ্ছে।’
পুলিশ মনে করছে বেশ কিছুদিন ধরেই বাহিনীর মধ্যে মনোবলের অভাব দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রের বৈধ ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৫ ই আগস্টের পর থেকেই পুলিশের মনোবল অনেকটা ভেঙে গেছে। সন্ত্রাসীরা হামলা করলে পুলিশ নিজেদের অস্ত্র ব্যবহার করতে সাহস পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অস্ত্র ব্যবহারের ওপর মৌখিকভাবে কিছুটা চাপ সৃষ্টি করার কারণে পুলিশ আত্মরক্ষার সময়ও অস্ত্র ব্যবহার করতে পারছে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহারের আইন অনুযায়ী যদি অস্ত্র ব্যবহার করতে জোরালোভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে বাহিনীগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে পারবে বলে উল্লেখ করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।




