জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক–২০২৬-এ ‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসার’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সোনারগাঁ উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফারজানা রহমান যিনি বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক),ঢাকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে এই পদক গ্রহন করেন তিনি ।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনেসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
পদক প্রদান অনুষ্ঠানটি সারাদেশে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সোনারগাঁ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানটি সরাসরি উপভোগ করেন নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান , উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিন্নাতসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
ইউএনও ফারজানা রহমান সোনারগাঁ উপজেলায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি সোনারগাঁ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—শুধু পাঠদান নয়, বরং শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা, নৈতিক শিক্ষা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নিরাপদ বিদ্যালয়—সবকিছু মিলিয়েই নিশ্চিত হবে একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি একের পর এক ব্যতিক্রমী ও জনবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে উপজেলার ১১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু করেন ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল রূপ দিতে ১৫টি বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট উদ্বোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তথ্যপ্রযুক্তিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে ১৫টি বিদ্যালয়ের ৪৫ জন শিক্ষার্থীকে কম্পিউটার বিষয়ক মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী অনুশীলনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ ও নেতৃত্বের বিকাশে আয়োজন করা হয় আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। একই সঙ্গে প্রথম শ্রেণির প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য চালু করা হয় ‘বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্ড’, যার মাধ্যমে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসাসেবা এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বিশেষ সুবিধা লাভের সুযোগ পায়।
বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ, মাদক, ভূমি সেবা এবং সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়ে সচেতন করা হয়। কুইজ, সেমিনার ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।
শিক্ষার্থীদের আর্থিক বৈষম্যের কারণে যেন শিক্ষা ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে শতভাগ স্কুল ইউনিফর্ম নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রয়োজনভিত্তিক ইউনিফর্ম, জুতা, ব্যাগ, খাতা ও কলম বিতরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে ডাস্টবিন সরবরাহ, শ্রেণিকক্ষ পরিচ্ছন্ন রাখা, ফুলের বাগান সৃষ্টি, ফলজ গাছ রোপণ এবং মনোরম শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।
অভিভাবকদের জন্য বিদ্যালয়ে অপেক্ষাকক্ষ ” অভিভাবক ছায়াতল” নির্মাণ, নিয়মিত ক্লাস্টারভিত্তিক বিদ্যালয় পরিদর্শন, দুর্বলতা চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক সমাধান, মাঠ ভরাট, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, গাইড ওয়াল ও প্যালাসাইডিং স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে খেলাধুলার সামগ্রী, ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য জার্সি বিতরণ এবং ক্রীড়াচর্চাকে উৎসাহিত করা হয়।
বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের দখলকৃত জমি উদ্ধার করে সীমানা নির্ধারণ এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের মতো সাহসী প্রশাসনিক উদ্যোগও ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এসব কার্যক্রম বিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষা এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাবেক ইউএনও ফারজানা রহমানের নেতৃত্বে সোনারগাঁয়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে শিক্ষার প্রতি নতুন আস্থা ও অংশগ্রহণ সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই মডেল আজ দেশের অন্যান্য উপজেলার জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক–২০২৬-এ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে তাঁর এই স্বীকৃতি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি সোনারগাঁ উপজেলার প্রতিটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টারও মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। তাঁর এই সাফল্য দেশের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে উদ্ভাবনী, মানবিক ও দূরদর্শী প্রশাসনিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।




