নিজস্ব প্রতিনিধি:
বিএনপি ছেড়ে প্রয়াত বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা প্রথমে গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ ন্যাশলিস্ট ফ্রন্ট অর্থাৎ বিএনএফ। ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও সদর উপজেলা বিএনএফ এর কমিটিও প্রকাশ পায়। দলটির নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া নারায়ণগঞ্জ জেলা ও সদর উপজেলা কমিটির তালিকা প্রকাশ পায়। কমিটিতে থাকা ব্যক্তিরা সকলেই এর আগে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। বিএনএফ কমিটিতে যাদের নাম এসেছিল বর্তমানে সেইসব ব্যক্তিরা জেলা ও মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে পাকাপোক্ত অবস্থানে রয়েছেন। দীর্ঘ ১১/১২ বছরে বিষয়টি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই পুরোনো কাসুন্দি নতুন করে ঘাঁটা দিয়েছেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা।
মুলত ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও তৎকালীন শহর বিএনপির সম্মেলনে অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার সভাপতি ও কাজী মনিরুজ্জামান মনিরকে সাধারণ সম্পাদক পদে জেলা বিএনপির কমিটি এবং প্রয়াত জাহাঙ্গীর আলম সভাপতি ও বিএনপির সাবেক নেতা এটিএম কামালকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে শহর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়।
উক্ত সম্মেলনের বিরোধীতা করে বিদ্রোহী কমিটি গঠন করেন বিএনপির একটি অংশের নেতারা। প্রয়াত নেতা কমান্ডার সিরাজুল ইসলামকে সভাপতি ও আব্দুল হাই রাজুকে সাধারণ সম্পাদক করে পাল্টা জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করে বিদ্রোহীরা। একইভাবে নুরুল ইসলাম সর্দারকে সভাপতি, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে সাধারণ সম্পাদক ও অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে পাল্টা বিদ্রোহী শহর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করেন। যদিও সম্মেলন ঠেকাতে আদালতে মামলাও করেছিল বিএনপির বিদ্রোহীরা। ওই সম্মেলনের পর মুল কমিটিতে জায়গা না পাওয়া নেতারাই মুলত পরবর্তীতে নাজমুল হুদার বিএনএফে যোগদান করেছিলেন।
এদিকে চলতি বছরের গত ৩ জানুয়ারী শুক্রবার বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ছাত্র সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবুল কাউসার আশা বলেছেন, ২০১৩/১৪ সালে আমরা যখন রাজপথে আন্দোলন করছিলাম, সেই সময় সেইসব ব্যক্তিরা বিএনএফ কমিটি গঠন করেছিল। বিএনএফ এর কমিটি গঠন করা ব্যক্তিরা আজকে ত্যাগের গল্প শোনায়। খালি কলসি বাজে বেশি।
ওই অনুষ্ঠানে আবুল কাউসার আশা কারো নাম উল্লেখ না করলেও বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিএনএফ কমিটিতে বিএনপির কোন কোন নেতারা জড়িত ছিল? বিএনপির দল ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রকারী কারা? যদিও বিএনএফ কমিটিতে নাম আসা ব্যক্তিরা বর্তমানে জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটির শীর্ষ পদে আছেন অনেকেই। অনেকেই সামনে শীর্ষ পদে আসার প্রতিযোগীতায় আছেন। অনেকেই বিএনপির রাজনীতিতে পাকাপোক্ত অবস্থানে আছেন।
ঘটনা সূত্রে, ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনএফ কমিটি ১৫ সদস্য এবং সদর উপজেলা শাখার বিএনএফের ১৪ সদস্যের পৃথক দুটি আহবায়ক কমিটি নিবন্ধন আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। জেলা বিএনএফ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আবু আল ইউসুফ খান ও সদস্য সচিব পদে ছিলেন মাসুকুল ইসলাম। প্রত্যেকেই নামের শেষাংশ অর্থাৎ ডাকনাম যুক্ত ছিল না। প্রত্যেকের আইডি কার্ড অনুযায়ী নাম তালিকায় দেখা যায়।
কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে ছিলেন- রহিমা শরীফ, আনোয়ার প্রধান, কামরুল
হোসেন এবং সদস্য পদে ছিলেন কবির প্রধান, কাজী রুবায়েত হোসেন, মাহফুজুর
রহমান, আল আমিন, মোল্লা সাখাওয়াত হোসেন, সাফিয়া ইসলাম, মাহবুব সোবহান, কুতুবউদ্দিন ও আবদুল ইউসুফ। এ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা কমিটিতে ছিলেন আহ্বায়ক রিয়াজুল ইসলাম আজাদ ও সদস্য সচিব ছিলেন ফারুক হোসেন। কমিটিতে যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন- রাশেদুন নবী, মোহাম্মদ হোসেন বাদল ও মনির হোসেন খান, সদস্য পদে ছিলেন হাবিবুর রহমান মিন্টু, আনিস শিকদার, মাহবুবুর রহমান, মাহাববুউল্লাহ, আবদুল আজিজ, মাহাবুবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, বরকতউল্লাহ ও দুলাল হোসেন।
যদিও এসব নেতাদের অনেকেই কমিটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সংবাদ সম্মেলন করে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু আবু আল ইউসুফ খান টিপু সহ অনেকেই চুপসে ছিলেন। টিপু মহানগর বিএনপির বর্তমান কমিটির সদস্য সচিব। এর আগের কমিটিতে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। শোনা যাচ্ছে সাখাওয়াতকে মাইনাস করে তিনিই হতে যাচ্ছে মহানগর বিএনপির সভাপতিও। মাসুকুল ইসলাম জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক তিনি।
এ ছাড়াও রহিমা শরীফ মায়া জেলা মহিলা দলের আহ্বায়ক, কবির প্রধান ফতুল্লা থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আনোয়ার প্রধান বর্তমানে সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি পন্থী আইনজীবীদের সংগঠন আইনজীবী ফোরামের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন। বিএনপির সমর্থনে তিনি আইনজীবী সমিতিরও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। তার বন্ধু কাজী রুবায়েত হোসেন মহানগর বিএনপির আগের কমিটিতে সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা এরশাদের সঙ্গে রাজনীতি করেন। বিদিশা ফাউন্ডেশনের পরিচালকও হোন। বিদিশার সঙ্গে পল্টি দিয়ে এরশাদের আরেক স্ত্রী রওশন এরশাদের বলয়ে যোগদান করে জাতীয়পার্টির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য হোন কাজী রুবায়েত। বিদিশার সঙ্গে সখ্যতা ছিল টিপু ও আনোয়ার প্রধানেরও। বিরোধ দেখা দিলে রুবায়েতের পক্ষে বিদিশার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ কোর্টে মামলাও করেন আইনজীবী আনোয়ার প্রধান।
আল আমিন সহকারী এ্যাটর্ণি জেনারেল হয়েছেন। বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। রিয়াজুল ইসলাম আজাদ মৃত্যুবরণ করেছেন। মনির হোসেন খান জাকির খানের আপন চাচা। মনির হোসেন খান বর্তমানে মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। ফারুক হোসেন মহানগর বিএনপির সাবেক কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মাহাবুব উল্লাহ ও বরকত উল্লাহ মহানগর বিএনপির সদস্য। আব্দুল আজিজ ও মাহাবুবুর রহমান মৃত্যুবরণ করেছেন।




