ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে, দেওয়া হচ্ছে জনসচেতনতার বার্তা। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার আহ্বানও জানানো হচ্ছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সেহাচর তক্কারমাঠ এলাকার বাস্তব চিত্রে উঠছে ভিন্ন এক প্রশ্ন- যে এলাকায় মানুষের চলাচলের সড়কেই বছরের পর বছর হাঁটুসমান পানি জমে থাকে, সেখানে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংস ও প্রতিরোধ কার্যক্রম কতটা কার্যকর হবে?
শনিবার (৩ অক্টোবর) সেহাচর তক্কারমাঠ এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬ কর্মসূচিতে অংশ নেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় কর্মসূচিতে।
কিন্তু কর্মসূচিকে ঘিরে স্থানীয়দের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার বিষয়টি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সেহাচর তক্কারমাঠ এলাকার একটি সড়কে ১২ মাসই পানি জমে থাকে। বর্ষা মৌসুমে কোথাও কোথাও সেই পানি হাঁটু উপর পর্যন্ত উঠে যায়। তাই শুধু বাড়ির আঙিনা নয়, মানুষের চলাচলের সড়ক ও আশপাশের এলাকাতেও দীর্ঘসময় পানি জমে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে সে সময় মানুষ বাসা থেকে কেউ বেড় হতে পারেনা, এমন কি শিক্ষার্থীদের স্কুল কলেজে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে যখন জমে থাকা পানি অপসারণের কথা বলা হচ্ছে, তখন বছরের পর বছর সড়কে জমে থাকা পানি কেন স্থায়ীভাবে অপসারণ করা হচ্ছে না?
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কোনো এলাকার প্রধান সড়ক ও আশপাশের জায়গা যদি দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার উদ্যোগও অনেকটা বাধাগ্রস্ত হয়।
এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে সড়কে মানুষের চলাচলই হাঁটু পানির মধ্যে দিয়ে করতে হয়, সেখানে বাড়ির আঙিনায় পানি জমবে না- এটা কীভাবে সম্ভব? ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হলে আগে এলাকার জমে থাকা পানি সরাতে হবে।
আরেক বাসিন্দার অভিযোগ, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা ভোট চাইতে এলাকায় আসেন। তখন মানুষের দুর্ভোগের কথা শোনা হয় এবং পানির মধ্যেও মানুষের কাছে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু নির্বাচনের পর জলাবদ্ধতা নিরসনে তাদের নিয়মিত দেখা যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের ভাষায়, শুকনো সড়ক দিয়ে হেঁটে এসে শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধের কথা বললে এলাকার প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। পানির মধ্যে দিয়ে আমাদের মতো করে হাঁটতে হবে, তাহলেই বোঝা যাবে মানুষের দুর্ভোগ কতটা।
স্থানীয়রা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা—সবই প্রয়োজন। তবে এর পাশাপাশি জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান না হলে এসব উদ্যোগের সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
তাদের দাবি, সেহাচর তক্কারমাঠ এলাকার পানি জমার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোথায় পানি আটকে থাকছে, কোন নালা বা ড্রেনের কারণে পানি বের হতে পারছে না, এসব চিহ্নিত করে নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধকে শুধু মৌসুমি অভিযান হিসেবে না দেখে জলাবদ্ধতা নিরসন, মশক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
কর্মসূচির শুরুতে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন উল্লেখ করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
তবে এলাকাবাসীর বক্তব্যও স্পষ্ট -সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলুক, কিন্তু তার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতারও সমাধান চাই। কারণ পানি জমে থাকার পরিবেশ যদি থেকেই যায়, তাহলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানোর লড়াইয়ে স্থায়ী সাফল্য পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নাঈমা ইসলাম, কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মনিরুল আলম সেন্টু, ফতুল্লা থানা বিএনপির সহ-সভাপতি হাজী শহিদুল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রুহুল আমিন সিকদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এলাকাবাসীর দাবি ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন বা সচেতনতার কর্মসূচি নয় সেহাচর তক্কারমাঠের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানই হতে পারে এই এলাকার মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।




