আওয়ামী লীগের বয়স ৭৭ বছর পুরো হলো এমন এক সময়, যখন দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ রয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে। এমন সংকটে বিপর্যস্ত এই দলকে মাঝেমধ্যে সড়কে ঝটিকা মিছিল আর সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা– মোটামুটি এভাবেই দেখা যাচ্ছে।
তথ্যসুত্রঃ বিবিসি বাংলা
বারবার ফেরত আসার কথা বললেও ২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকারের পতন হওয়ার পর থেকে এখনও রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে পারেনি দলটি।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে তৎপরতা বেড়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাদের গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীর সংখ্যাও।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলটি রাজনীতিতে ফিরতে পারে, এমন আলোচনা ছিল রাজনীতিতে।
কিন্তু সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনসহ আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা, এমনকি তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে বিএনপি সরকার।
এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অফলাইনে সীমিত আর অনলাইনের ব্যাপক তৎপরতায় দলটি আসলে কতটা সুবিধা করতে পারবে, উঠছে সেই প্রশ্নও।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে ঘিরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ শাসনের যে তৎপরতা, তা নিয়ে দলটির মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে না – যা দলটির মূলধারার রাজনীতিতে ফেরা, এমনকি জনসমর্থন পাওয়ার বিষয়টিকেও আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
কী করছে আওয়ামী লীগ?
প্রতিষ্ঠার ৭৭ বছরের ইতিহাসে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
তার আগে একই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।
নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদেও সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দেশের ভেতরে দলটির কার্যক্রম চালানো আইন অনুযায়ী সম্ভব নয়।
তা সত্ত্বেও দলটির নেতাকর্মীদের রজাধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে। সঙ্গে বাড়ছে গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীর সংখ্যাও।
এছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও রয়েছে দলটির কর্মী–সমর্থকদের সরব উপস্থিতি।
অবশ্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম চার আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য বিপ্লব হাসান পলাশের দাবি, এগুলো তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞের “ছোটো একটা অংশ“।
তিনি বলছেন, তাদের একক শীর্ষ নেতৃত্ব সারাদেশের নেতাকর্মীদের সাথে যুক্ত আছেন এবং তাদের করণীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
এছাড়া দলীয় নেতাদের অনেকে দেশের বাইরে কিংবা কারাগারে থাকায় নতুন করে দলের ‘চেইন অব কমান্ড‘ সাজানোর মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে সক্রিয় এবং জনসাধারণের সাথে যুক্ত হবার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন এই নেতা।
“কিছু বিদেশে আছে বা জেলাখানায় আছে, সে জায়গাগুলোর রিপ্লেসমেন্ট তৈরি করে দেয়া। সেই দায়িত্বগুলো দেয়া হচ্ছে। আন্দোলনের মাধ্যমেই মানুষের অধিকারের পাশাপাশি নেত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা এবং আওয়ামী লীগকে স্বমহিমায় নেত্রীকে সমেত প্রতিষ্ঠা করার জন্য আওয়ামী লীগ কাজ করে যাচ্ছে“, বলেন তিনি।
দলের বিষয়ে মি. পলাশ বিশেষ আশাবাদী হলেও, মাঠের রাজনীতিতে তা খুব একটা কাজে আসছে না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বরং তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের এই নেতার মতো কয়েকজন ছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বের বেশিরভাগই দেশের বাইরে থাকায় দলটির কার্যক্রম কেবল সামাজিক মাধ্যমেই সীমিত হয়ে আছে।
সেটাও আবার অনেক সময় ভুয়া এবং অপতথ্য ছড়ানোর পাশাপাশি রুচির গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে, যা জনসংযোগের বিপরীতে দলটিকে জনবিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞ একটি দল কেন তা করছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক কাজী মারুফুল ইসলামের মতে, আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই দেশের বাইরে কিংবা পালিয়ে থাকার কারণে দলটির নেতৃত্ব সুসংগঠিত নেই।
“ফলে সুসংগঠিতভাবে তৃণমূল পর্যায়ের মতামত নিয়ে সাংগঠনিক বিন্যাস করার সুযোগ দলটি পাচ্ছে না কিংবা তাদের যে শক্তি আছে সেটার সম্পূর্ণ ব্যবহার দলটি করছে না“, বলেন তিনি।
তবে কোনো ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক বা অপপ্রচারে না গিয়ে মূলধারার গণতান্ত্রিক কার্যক্রম ফিরে আসার আইনি প্রক্রিয়া মোকাবেলা করার মাধ্যমেই দলটির সক্রিয় হওয়ার সুযোগ নেয়া উচিত বলে মনে করছেন অধ্যাপক ইসলাম।
দেশের ভেতরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও বিদেশে পালিয়ে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা কর্মসূচি দিয়ে সক্রিয় হবার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ।
এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোতে যাওয়া এনসিপি নেতাদের ওপর ডিম ছুঁড়ে আক্রমণও তাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে উঠেছে।
যদিও বিপ্লব হাসান পলাশের দাবি, ডিম যাদের ছোঁড়া হচ্ছে সেটা তাদেরই “এক্টিভিটিজ“।
একই সাথে তিনি দাবি করেন, “একজন কর্মক্ষম মানুষ যিনি কর্ম করে খাবে সে তার কর্মস্থলে যেতে পারছে না। এই ধরনের ঘৃণার পরিবেশ যারা করেছে, মবোক্রেসির মাধ্যমে এটা করেছে। সেখানে ডিমটা প্রতীকী আর তাদের এক্টিভিটিজ তাদের বোঝানোর জন্য“।
নিজেদের তৎপরতার মাধ্যমে কেবল দল গোছানোই নয়, জনগণের সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালানোর কথা বলছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও।
তিনি বলেন, “বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা আমরা চালাচ্ছি। সবগুলোই গণতান্ত্রিক। জনগণকে আমরা সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি, জনগণের সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছি“।
“আওয়ামী লীগের, তৃণমূলের এবং ১৪ দলের নেতাকর্মীরা, প্রগতিশীল মানুষরা যতটুকু সামর্থ আছে, ততটুকু নিয়েই তারা চেষ্টা চালাচ্ছে। এই চেষ্টাই সফল হবে এবং চেষ্টার মধ্য দিয়েই একদিন সফল হয়। আমাদের ইতিহাস আছে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। আমরা এভাবেই সফল হয়েছি“, বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. নাছিম।
তবে রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতৃত্ব না থাকাই দলটির জন্য এখন প্রধান সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের জায়গা থেকে দল পরিচালনার জন্য সম্ভাব্য স্ট্রাটেজি (কৌশল) কী হবে, কীভাবে তার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসবে তা নিয়ে হয়তো আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা সংকট কাজ করছে। সে কারণেই তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটা এলোমেলো ভাব আর এক ধরনের ভাবাবেগ কাজ করছে“, বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।
ভাবাবেগতাড়িত না হয়ে বাস্তবতার নিরিখে সময়কে স্বীকার করে নিয়ে এগোলে আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসতে পারবে বলে মনে করেন এই রাজনীতি বিশ্লেষক।
নির্বাচিত সরকার আসার পরও বদলায়নি রাজনৈতিক বাস্তবতা
গণ–অভ্যুত্থানের পর গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেসময়ই নিষিদ্ধ হয় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয় আওয়ামী লীগসহ দলটির সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের।
অনেকেই ধারণা করেছিলেন নির্বাচিত সরকার আসার পর পরিবর্তন হবে সেই দৃশ্যপটের।
কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। নির্বাচিত বিএনপি সরকার রাজনীতিতে দলটিকে কোনো জায়গাতো করেই দেয়নি, বরং জাতীয় সংসদে অনুমোদনও দেয় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ।
ঝটিকা মিছিল থেকে ধরপাকড়তো চলছিলোই, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ সতর্কতা জারি করার পাশাপাশি কেবল রাজধানীতেই ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে নাশকতার আশঙ্কায় ২২ থেকে ৩০ জুন – এই ৯ দিনের জন্য ঢাকা, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।
এনিয়ে সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, “যেকোনো রকমের অপতৎপরতা এড্রেস” করার জন্য এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, কিন্তু শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ মাফিয়া বাহিনী আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্টে আমরা দেখছি তারা কিছু মিছিল–মিটিং করার মতো কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে দু‘য়েকটা জায়গায়“।
“তাতে করে আমাদের মনে হয়েছে তারা হয়তো একটা অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করলেও করতে পারে। এই বিবেচনায় আমরা আমাদের সমস্ত বাহিনীগুলোকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি যা তারা সবসময়ই থাকে“, বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সার্বিক দিক মিলিয়ে সহসাই আওয়ামী লীগের বর্তমান দৃশ্যপটের পরিবর্তন হবে না বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলছেন, সংসদে কার্যক্রম নিষিদ্ধের আইন পাশ করা থেকে বোঝা যাচ্ছে বিএনপি এই সিদ্ধান্ত এক–দুদিনের জন্য নেয়নি।
“এটা একটা দীর্ঘ সময়ের হিসাব মাথায় রেখেই করা হয়েছে। অন্তত পাঁচ বছরের মধ্যে দলটি ফিরতে পারবে না, তারা তা নিশ্চিত করলো। আওয়ামী লীগ আইনি প্রক্রিয়ায় যাত্রা শুরু করলেও সেটা সময় গড়িয়ে পাঁচ বছর যাবেই“, বলেন তিনি।
অনেকটা একই কথা বলছেন অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। তার মতে, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রবল প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ।
এখন যখন বিএনপি সরকার গঠনের পর সব প্রতিষ্ঠান গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে, তখন প্রবল প্রতিপক্ষকে তারা সুযোগ দেবে না বলেই মনে করছেন তিনি।
“এতে আরও সময় লাগবে। তবে এটা করার জন্য দুটো রাস্তা আছে। একটা হচ্ছে আইনি পন্থা – আইনিভাবে মোকাবেলা করতে হবে“।
“আরেকটা হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা। অর্থাৎ আওয়ামী লীগেরও এখন এই সরকারি দল এবং যেসব রাজনৈতিক দল এই মুহূর্তে আছে, এদের সাথে রাজনৈতিক যে যোগাযোগ এবং যে বোঝাপড়ার জায়গাটার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে“, বলেন অধ্যাপক ইসলাম।




