সংবাদ সম্মেলনের নামে নিজের ফাঁদে নিজেই পা দিলেন কৃষকদল নেতা জুয়েল আরমান!
ষ্টাফ রিপোর্টার:
সংবাদ সম্মেলনের নামে ভিডিও বার্তায় নিজেই নিজের ফাঁদে পা দিলেন কৃষক দল নেতা জুয়েল: আর পাওনা টাকা আদায়ের অজুহাতে অপহরণের দায় স্বীকার করলেন তিনি নিজেই!
স্থানীয়ভাবে বিচার পাওয়ার সব দুয়ার বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ কোথায় দাঁড়াবে? নারায়ণগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই প্রশ্নকেই বড় করে তুলছে। রাজনৈতিক দাপট আর প্রশাসনের একশ্রেণীর কর্মকর্তার নীরব ভূমিকায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পনগরীতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন তলানিতে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, খোদ নিজ জেলায় সংবাদ সম্মেলন করার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলছেন ভুক্তভোগীরা, প্রতিকারের আশায় তাদের ছুটতে হচ্ছে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে।
সম্প্রতি ফতুল্লার সেহাচর তক্কারমাঠ এলাকার আবাসন ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন দিলুর সাথে ঘটে যাওয়া এক লোমহর্ষক ঘটনা জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নাজুক রূপটিকেই জনসমক্ষে এনেছে।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী দিলু তার ওপর নেমে আসা অন্যায়ের বিবরণ দেন। তিনি জানান, গত ২০ মে রাতে ফতুল্লার তক্কারমাঠ এলাকা থেকে ডিবি বা পুলিশ পরিচয়ে একদল সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে ফতুল্লার ডিআইটি মাঠে এনে জিম্মি করে তার ওপর চালানো হয় তীব্র শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন দেলুর কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে ফতুল্লা থানা কৃষক দলের আহবায়ক জুয়েল আরমান বাহীনী। শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে অপহরণকারী জুয়েল আরমানে হাতে নগদ ৩ লাখ টাকা এবং ৫ লাখ টাকার একটি ব্যাংক চেক (মোট ৮ লাখ টাকা) তুলে দিয়ে কোনোমতে রক্ষা পান তিনি।
ব্যবসায়ী দিলুর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এই পুরো অপহরণ ও অর্থ আদায়ের মিশনটির মাস্টারমাইন্ড বা নেপথ্যের মূল কারিগর ফতুল্লা থানা কৃষকদলের আহ্বায়ক জুয়েল আরমান।
আর স্থানীয়দের দাবী,যদি ডিবি বা পুলিশ কিংবা সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি পরিচয়ে জুয়েল আরমান দেলুকে উঠিয়ে এনে টাকা আদায় করে থাকে তাহলে জুয়েল আরমানকে কেন আইনের আওতায় নেয়া হচ্ছেনা ? কারন এভাবেই পুলিশ পরিচয়ে বিভিন্নস্থানে সাধারন মানুষকে উঠিয়ে নিয়ে টাকা হাতিয়ে অপহরন-হত্যা-গুমের মত অপরাধ করে বেড়াচ্ছে জুয়েল আরমানদের মত কিছু অর্থলোভী নেতা ও অপরাধীরা।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, ঘটনার পরপরই তিনি স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন এবং লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন । কিন্তু রহস্যজনক কারণে স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষই অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে নিজ জনপদে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং কথা বলার অধিকার হারিয়ে তিনি দূর রাজধানীতে গিয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।
সচেতন মহলের মতে, একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী যখন নিজ এলাকার থানা বা প্রেস ক্লাবে নিরাপদ বোধ করেন না, তখন বুঝতে হবে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন ধরেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।
সচেতন মহলের প্রশ্ন: যদি এটি শুধুই সাধারণ বাণিজ্যিক বা জমির বিরোধ হয়ে থাকে, তবে কেন একজন ব্যবসায়ীকে নিজ এলাকা ছেড়ে জীবনের ঝুঁকিতে রাজধানীতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে হলো? কেন তিনি স্থানীয় থানায় নিরাপদ বোধ করলেন না?
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্দর এলাকা থেকে ফতুল্লায় এসে চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এই জুয়েল আরমান। স্থানীয়রা জানান, একটা সময় যার মাথা গোঁজার ঠাঁই বা নিজস্ব উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদ ছিল না, তিনি এখন রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক বনে গেছেন। যদিও সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন যে সম্পদ বিক্রি করেই নাকি রাজনীতি করছেন কিন্তু বাস্তবটা হচ্ছে উল্টো। লালপুরে মাইনুদ্দিন মেম্বারের বাড়ির পাশেই জুয়েল আরমানদের যে সম্পদ রয়েছে তাতে ওরা তিন ভাই মাত্র একটি করে রুমের মালিকানা পাবেন এখন বুঝতে হবে যে কি পরিমানে সম্পদ রয়েছে আর তা বিক্রিই বা করলেন কখন। ৫ই আগস্টের পর এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার ছত্রচ্ছায়ায় পুরো ফতুল্লা থানা এলাকাজুড়ে অপরাধের এক স্বর্গরাজ্যে গড়ে তুলেছেন তিনি।
এদিকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এবং ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’ সাজতে সাংবাদিকদের কাছে একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন অভিযুক্ত জুয়েল আরমান। সেখানে তিনি দাবি করেন, দিলু নাকি আওয়ামী লীগের দোসর এবং মানুষের কাছ থেকে নামজারি (মিউটেশন) ও জমি দেওয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
তবে ভিডিও বার্তায় নিজের অজান্তেই অপরাধের কথা স্বীকার করে বসেন জুয়েল। তিনি বলেন, তিনি দিলুকে অপহরণ করেননি, বরং দিলুকে সামনে পেয়ে পাওনা ৮ লাখ টাকা আদায়ের জন্য তাকে আটক করে ৩ লাখ টাকা ক্যাশ এবং ৫ লাখ টাকার চেক নিয়েছেন।
জুয়েল আরমানের এমন স্ববিরোধী বক্তব্যে সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন- প্রথমত, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি পাওনা টাকার জন্য অন্য কাউকে এভাবে জোরপূর্বক আটক করতে পারেন না। এটি স্পষ্টত আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং অপহরণের শামিল।
দ্বিতীয়ত, দিলু যদি সত্যিই আওয়ামী লীগের দোসর হন, তবে জুয়েল আরমান কেন এই ‘আওয়ামী দোসরের’ সাথে জমি বা টাকার ব্যবসায় জড়াতে গেলেন?
তৃতীয়ত, জুয়েল আরমান মূলত নিজেকে বাঁচাতে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেই নিজের ফাঁদে ফেঁসে গেছেন।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ৫ই আগস্টের পর ফতুল্লা থানা বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার খলিফারা ব্যবসায়ী দিলুকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, ওই নেতার খলিফারা দিলুকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সেহাচর তক্কারমাঠসহ আশেপাশের এলাকায় কোনো জমি বিক্রি বা কিনতে হলে তাদের সাথে রেখেই করতে হবে, অন্যথায় তিনি এই এলাকায় বসবাস করতে পারবেন না।
এছাড়াও জুয়েল আরমানের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। ফতুল্লার দাপার খোঁজপাড়া এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী, বর্তমানে মালেশিয়ায় অবস্থানরত স্বেচ্ছাসেবক লীগের স্বপন ওরফে কেরা স্বপন হিসেবে পরিচিত এই স্বপনের সাথে জুয়েল আরমানের গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে একাধিক মাদক মামলার আসামি হয়ে এই কেরা স্বপন দেশ ত্যাগ করলেও তার সিন্ডিকেটের দেখভাল এখন জুয়েলের হাতেই রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। যে কারনে জুয়েল আরমান প্রায় সময়ে মালেশিয়াতে ট্যুরে যায়। একটি ছবিতে দেখা যায় যে,জুয়েল আরমান এবং শ্রমকল্যান প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির সাথে সেই কেরা স্বপনের একটি ছবি।
সত্য ঘটনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেও এখন চরম নিরাপত্তাহীনতা ও বিপাকে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন দিলু। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধের বিস্তার এবং প্রশাসনের একশ্রেণীর কর্মকর্তার রহস্যজনক নীরবতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফতুল্লাবাসী অবিলম্বে এই চাঁদাবাজ ও অপহরণকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
যদিও এ বিষয়ে অভিযুক্ত জুয়েল আরমান অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি একটি জমি লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেলোয়ার হোসেন পূর্বে জমির বায়না হিসেবে অর্থ দিয়েছিলেন, যার একটি চেক পরবর্তীতে ডিজঅনার হয়। সেই বিরোধের জের ধরেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন দেলু বলেন,জুয়েল আরমান যেটা বলছে তা সম্পুর্ন মিথ্যা। আমি ওর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকী দিয়ে আসছে যে কারন আমি এলাকার বাহিরে অবস্থান করছি। ওরা বিভিন্ন লোকজন আমার বাড়িতে পাঠাচ্ছে আমার খোজে কিন্তু আমাকে না পেয়ে বাড়ির ভাড়াটিয়াদেরকে ভয় দেখাচ্ছে। তিনি আরও বলেন,জুয়েল যেটা বলছে তা বানোয়াট কথা। আর আমি যদি মিথ্যা বলে থাকি তাহলে সেটা প্রমান করুক। আমি ওর বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে অভিযোগ জমা দিয়েছি।
বি:দ্র: ৫ আগষ্ট পরবর্তী বিভিন্ন অপকর্মসহ নানাবিধ অনৈতিক উপায়ে বিপুল টাকার মালিক বনে যাওয়া নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চোখ রাখুন জাগো নারায়ণগঞ্জে।