ষ্টাফ রিপোর্টার:
সারাদেশে তেল-গ্যাস সংকটে সাধারন মানুষ যখন দিশেহারা আর তা সমাধানে সরকার যখন কিছুই করতে পারছেনা। কিন্তু ফতুল্লার পঞ্চবটীতে অবস্থিত বাংলাদেশ পেট্রোয়িাম কর্পোরেশনের দুইটি প্রতিষ্ঠান যমুনা ও মেঘনা ডিপোর পাশে থাকা তেলচোরদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে তেলচোরদের দৌরাত্ম দিনের পর বেড়েই চলছে। দিনে সূর্যের আলো আর রাতে অন্ধকারে প্রকাশ্যেই তেলচুরি মত্ত হয়ে উঠেছে রায়হান-সুমন-সুজনগং।
অনুসন্ধানে জানা যায় যে, দীর্ঘদিন ধরে এই স্থানে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ তেলচোর চক্র, যার মূল নেতৃত্বে রয়েছে ফাজিলপুরের তেল টোকাই অহিদের ছেলে রায়হান, রায়হানের ফুফাতো ভাই ড্রাইভার মান্নানের ছেলে সুজন, সুমন’সহ আরও বেশ কয়েকজন। তারা বিভিন্ন পন্থায় তেলচুরি করে রাতারাতি বিপুল অর্থ উপার্জন করছে এবং স্থানীয়ভাবে একধরনের প্রভাবশালী বলয় তৈরি করে ফেলেছে। আর নিজেদেরকে নিরাপদ রাখতে গড়েছেন আর.জে.টি এন্টারপ্রাইজ নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ রয়েছে, বনানী সিনেমা হলের কতিপয় কর্মচারী কর্মকর্তা সহযোগিতা নিয়েই এই চক্রটি হলের মালিকের একটি দোকান ভাড়া নিয়ে নির্বিঘ্নে তাদের অবৈধ তেলচুরি ও বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আরো অভিযোগ রয়েছে যে,হলের নাইটগার্ডের সাথে আতাত করে উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের তেলচোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা মাঝেমধ্যে রাত ১২টার পর হলের অভ্যন্তরে মাদকের আড্ডা’সহ অনৈতিক কর্মে লিপ্ত থাকে বলে সুত্রটি জানায়। এছাড়া আফাজউদ্দিন সাহেবের ওয়ার্কশপের সামনে চোরাই তেল সংরক্ষণের একটি গুদামঘর রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, হলের কর্মচারীদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আঁতাত ছাড়া সিনেমা হলের সামনে এতটা প্রকাশ্যে এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্ভব নয়। প্রতিদিন রাতেই বিভিন্ন পিকআপ, মোটরসাইকেল বা ছোট বাহনে করে তেল আনা-নেওয়া করা হয়। কখনও কখনও তেলের গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে যায়, কিন্তু কোনো পক্ষ থেকেই বাধা আসে না।
রায়হান ও সুজন,সুমন সম্পর্কে স্থানীয়রা জানান, তারা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এলেও অবৈধ তেল চুরির মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছে। তাদের নামে বর্তমানে মৃত রিপন সাহেবের নিকট থেকে খরিদকৃত ৫/৭ শতাংশের প্লট ও জায়গা রয়েছে। একেক জনের ৭/৮টা ট্যাংকলড়ি’সহ একাধিক মোটরসাইকেল ও দামী গাড়ী রয়েছে। আর রায়হানের ১৮ হাজার লিটার সম্পন্ন একটি ট্যাংকলড়ি রয়েছে তার পার্টনার হচ্ছে বর্তমান ট্যাংকলড়ি মালিক সমিতির সভাপতি এনায়েতনগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লিটন। বনানী হলের সামনে রাহয়ানগংদের যে অফিসটি রয়েছে সেটি নাকি এ লিটন চেয়ারম্যানের।
একাধিকসুত্রে জানা যায় যে, যমুনা কিংবা মেঘনা ডিপো থেকে ৯ হাজার লিটার সম্পন্ন একটি ট্যাংকলড়ি ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত পৌছানের আগ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার লিটারের মত তেল ধাপে ধাপে রাস্তার পাশে দাড় করিয়ে চুরি করছে এ তেলচোরের সিন্ডিকেটের সদস্যরা। যা একজন পাম্প মালিকের ক্ষতির পাশাপাশি ভুক্তভোগী করে তুলছে পাম্প মালিকদের। যে কারনে একজন গ্রাহক প্রতি ১ লিটার তেল ক্রয় করতে গেলে দেড় থেকে দুইশত মি.লি তেল কম পাওয়া যায়।
বিলাসবহুল জীবনযাপন, সদা নতুন পোশাক, দামি গ্যাজেট ব্যবহার-সব মিলিয়ে তারা এলাকায় একধরনের ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থবল ও প্রভাব খাটিয়ে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সহজেই এড়াতে সক্ষম হয়। তাদেও প্রকাশ্যে তেলচুরির ছবি কেউ তুলতে গেলে মুহুর্তের মধ্যেই চলে আসে তেলচোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এ সময় তারা উক্ত ব্যক্তির মোবাইল ফোন ছিনিয়ে রাখাসহ তাদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করারও একাধিক অভিযোগ রয়েছে এ সকল তেলচোরদের বিরুদ্ধে। আর রায়হান-সুমন-সুজনগংদের পক্ষে প্রকাশ্যে ট্যাংকলড়ি থেকে তেলচুরির নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন তাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী রাজিবসহ কয়েকজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, একাধিকবার প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও চক্রটির মূল হোতারা ধরা না পড়ে রহস্যজনকভাবে পালিয়ে যায় কিংবা পূর্বেই খবর পেয়ে এলাকা ছাড়ে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কোনো অদৃশ্য মহলের সহযোগিতায় তারা নিয়মিতই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অভিযানে ধরা পড়লেও কিছুদিনের মধ্যে আবার আগের মতই কার্যক্রম শুরু হয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তেলচুরির কারণে এলাকায় বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা। রাতের বেলায় চোরাচালানীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ পথচারী ও স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অনেকেই অভিযোগ করেন, তেলচোরদের কারণে এলাকায় চুরি, ছিনতাই এবং ছোটখাটো দুষ্কৃতিমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। স্থানীয় দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের দাবি, সিনেমা হলের সামনে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে অবৈধ গ্রুপের দৌরাত্ম্য চলতে থাকলে এলাকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।
এছাড়া রাতের বেলায় তেল লোড-আনলোডের সময় পরিবেশ দূষণ এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তেলের গন্ধ, ছিটকে পড়া তেল এবং বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের কারণে আশপাশের দোকান ও পথচারীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
স্থানীয়দের দাবি, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার ভয়াবহতা হতে পারে ব্যাপক, যা পুরো এলাকায় বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
এলাকাবাসী মনে করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তেলচোরদের এই বেপরোয়া অবৈধ সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হবে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তারা প্রশাসনের নিকট জরুরি ভিত্তিতে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়া বৈধ আয় বহির্ভুত সম্পদের অনুসন্ধান করতে দুদকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে রায়হানের ব্যবহৃত মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমি তেলের ব্যবসা করিনা। আমার বাবার তেলের গাড়ি রয়েছে। আপনি আসেন এবং দেখেন।




